পথ দুর্ঘটনার বিবরণ : প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিতে একটি পথ দুর্ঘটনার বিবরণ জানিয়ে তােমার বন্ধুকে চিঠি লেখাে। অথবা তোমার সামনে ঘটে যাওয়া পথ দুর্ঘটনার বিবরণ জানিয়ে বন্ধুকে চিঠি পত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিতে পথ দুর্ঘটনার বিবরণ জানিয়ে বন্ধুকে চিঠি।

পথ দুর্ঘটনার বিবরণ জানিয়ে বন্ধুকে পত্র

ঘাটসা, কুশমণ্ডি

৩ মার্চ, ২০২০

প্রিয়বরেষু

প্রিতম, বিছানায় অনেকক্ষণ শুয়ে থেকেও কিছুতেই ঘুমােতে পারলাম না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটা ভয়ংকর দৃশ্য। একটা আর্ত চিৎকারের ধ্বনি এখনও যেন কানে লেগে রয়েছে আমার। মনটাও ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় কিছুতেই ঘুম আসবে না ধরে নিয়ে তােকে চিঠি লিখতে বসলাম। সব কথা তােকে খুলে বললে হয়তাে কিছুটা হালকা হতে পারব।

আজ সকাল আটটা নাগাদ আমি সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলাম কুমোর পাড়ার দিকে। শিবম নামে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছিলাম একটা বইয়ের সন্ধানে। তুই তাে জানিস তাড়া না থাকলে আমি আস্তে আস্তে সাইকেল চালাতে পছন্দ করি। আজও তেমনি ধীরে সুস্থেই যাচ্ছিলাম। পােস্ট অফিসের মােড় পেরিয়ে দেখি একটি আট- দশ বছরের ছেলে একটা ছােট লাল-সাদা রঙের সাইকেল নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে। আমি তার কাছাকাছি আসতেই সে দ্রুত সাইকেলে উঠে আমার আগে আগে যেতে লাগল। আমি ইচ্ছে করেই একটু গতি বাড়িয়ে তাকে পেরিয়ে গেলাম। পিছন ফিরে দেখি সেও গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাপারটা বুঝে নিলাম। ও একটা প্রতিযােগিতা চাইছে। আমি গতি কমিয়ে দিতেই ছেলেটি আমাকে পেরিয়ে গিয়ে পিছন ফিরে একবার দেখে নিল। মুখে বিজয়গর্বের হাসি। রাস্তায় এরকমভাবে সাইকেল চালানাে বিপজ্জনক। ও যাতে আর আমার সঙ্গে প্রতিযােগিতা করে জোরে সাইকেল না চালায় সেজন্য আমি ওর বেশ কিছুটা পিছনে প্রায় শম্বুক গতিতে চলতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে দেখি ছেলেটিও আর জোরে চালাচ্ছে না। ও বােধহয় বুঝে নিয়েছে আমি ওকে পেরােতে পারব না।

এভাবেই অনেকটা পথ পার হয়ে আমি যখন বড় রাস্তা থেকে নেমে ডান দিকে ঘুরতে যাব, তখন ছেলেটির সঙ্গে আমার দূরত্ব বড় জোর কুড়ি পাঁচিশ ফুট। বাঁদিকে রাস্তার ধারে বাড়ি তৈরির জন্য কারা বেআইনিভাবে প্রচুর বালি ঢেলে রেখেছে। বালি গড়িয়ে নেমে এসেছে রাস্তার উপরেও। সামনের দিক থেকে ছুটে আসছিল একটা ট্রাক। ছেলেটি ট্রাকটিকে পথ ছেড়ে দেবার জন্য আরও বাঁদিক ঘেঁষে যেতেই বালির উপরে তার সাইকেলের চাকা পিছলে গেল। সে সাইকেল নিয়ে ছিটকে পড়ল রাস্তায়। আর সেই মুহূর্তে দ্রুতগতিতে আসা ট্রাকটিও চলে গেল তার উপর দিয়ে। একটা আর্ত চিৎকার এবং মুহূর্তেই সব শেষ। আমি চিৎকার করে উঠলাম। চিতকার করে উঠল আশপাশের লােকজনও। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে। ট্রাকচালক গাড়ির গতি বাড়িয়ে তখন নাগালের বাইরে। রাস্তায় পড়ে আছে বালকের থেতলে যাওয়া রক্তাক্ত দেহ। দেহ না বলে বলা উচিত একটা মাংসপিণ্ড। ভেঙেচুরে তালগাল পাকিয়ে গেছে লাল-সাদা ছােট্ট সাইকেলটি। ভিড় জমে গেল রাস্তায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবর পেয়ে ছেলেটির বাবা-মা এসে হাজির। মা আছড়ে পড়ল সেই প্রাণহীন বিকৃত দেহটার উপর। বাবার মুখে কথা নেই। চোখের সামনে এরকম একটা দুর্ঘটিনা দেখে আমি যে কতখানি বিচলিত হয়েছি, তা আমি তােক বলে বােঝাতে পারব না। যে ছেলেটি একটু আগে সাইকেলের গতিতে আমাকে হারাতে চেয়েছিল, সেই এখন হারিয়ে গেল চিরতরে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে আমি যে আঘাত পেলাম তা বােধহয় কোনােদিন মন থেকে মুছে যাবে না। বন্ধুর বাড়ি না গিয়ে আমি বাড়ি ফিরে এলাম। মনের মধ্যে অসম্ভব একটা চাপা যন্ত্রণা। সেইসঙ্গে রাস্তার ধারে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে যারা বালি ফেলে রেখেছিল তাদের উপরে রাগও হচ্ছে ভীষণ। ওইভাবে বালির স্তূপ না থাকলে হয়তাে নিষ্পাপ ওই বালকটিকে প্রাণ হারাতে হত না। শুধু কী তাই, ট্রাকচালকটিরও কী কোনাে দোষ নেই? তিনিই বা কেন অত দ্রুতগতিতে জনবহুল রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন? এইসব প্রশ্ন আর ভয়ংকর সেই দৃশ্যের অভিঘাতে বড়ই অস্বস্তিতে কেটেছে আজ সারাদিন। বুঝতে পারছি আজ রাত্রিটাও আমাকে জেগেই কাটাতে হবে। তুই আমার ভালােবাসা নিস।

ইতি

তাের কমল

এটিও পড়ুন – তােমার এলাকার হাসপাতালের দুরবস্থা কথা জানিয়ে সভাপতিকে পত্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *