কৃষি

রসুন চাষের সঠিক পদ্ধতি | এইভাবে রসুন চাষে 200% লাভজনক

রসুন চাষ করার পদ্ধতি । রসুনে সঠিক ভাবে সার প্রয়োগ পদ্ধতি

রসুন রান্নার মশলা ও ভেষজ ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। রসুন এর ইংরেজি নাম Garlic। বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালিয়াম স্যাটিভাম (Allium sativum)। রসুন চাষের সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করলে ১০০% এর অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব।

রসুন বাংলাদেশের এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অর্থকরী মসলা জাতীয় ফসল। এটি রান্নার স্বাদ, গন্ধ ও রুচি বৃদ্ধিতে অনেক বেশি ভূমিকা রাখে।

রসুনের উপকারিতা

রসুনের মধ্যে অনেক পুষ্টিগুন রয়েছে যেমন- প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন A.B.C.D, ফসফরাস, আয়রন, আয়োডিন, এবং উগ্র শক্তির জীবানুনাশক ৬ টি শক্তি।। রসুন ব্যবহারে অজীণর্তা, পেটফাঁপা, শুলবেদনা, হৃদরোগ, অর্শ, ক্রিমি, সর্দি, কাশি, টাইফয়েড, ডিপথেরিয়া, বাতরোগ, গুরুপাক, বলবর্ধক, শুক্রবর্ধক ও যে কোন প্রকার চর্মরোগ সারে।

এছাড়া রসুন থেকে তৈরি ঔষুধ নানা রোগ যেমন-ফুসফুসের রোগ, আন্ত্রিকরোগ, হুপিংকাশি, কানব্যাথা প্রভৃতিতে ব্যবহৃত হয় । রসুনের উপকারিতা ও গুণাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে রসুন এর ঔষধি গুণাবলী এর লেখাটি পড়ুন আশা করি কাজে আসবে।

রসুন চাষের সঠিক পদ্ধতি

 

রসুন চাষে লাভবান হতে হলে উন্নত জাতের রসুন চাষ করা আবশ্যক। বাজারে অনেক ধরনের রসুন চাষ করা হয়, এর মধ্যে উন্নত জাত হল ফাওয়ারি, এগ্রি ফাউত, যমুনা সফেদ প্রভৃতি।

উপযুক্ত জমি ও মাটি

মোটামুটি সব ধরনের মাটিতেই রসুন চাষ হয়ে থাকে। তবে, জলনিকাশি ব্যবস্থাযুক্ত এবং উর্বর দোয়াঁশ মাটি রসুন চাষের পক্ষে আদর্শে। তবে এঁটেল দো-আঁশ মাটিতেও চাষ করা যায়। এঁটেল মাটিতে কন্দ সুগঠিত হয় না। পশ্চিমবঙ্গের দুই দিনাজপুর বাংলাদেশের দিনাজপুর, রংপুর, নাটোরের গুরুদাসপুর ও বরাইগ্রাম, পাবনা জেলার চাটমহর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার তারাশ উপজেলায় রসুন বেশি উৎপাদিত হয়।

রসুন চাষের আবহাওয়া

রসুন মূলত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের চাষ। আশ্বিন থেকে কার্তিক মাস রসুন বোনার আদর্শ সময়। তবে, ঠান্ডা আবহাওয়া রসুন চাষের পক্ষে অনুকূল। তাই শীতকালে রসুন চাষ করাই ভাল।

রসুনের বীজ বপন

অন্যান্য আনাজের মতো রসুনের চারা তৈরি হয় না। মূল জমিতে সরাসরি রসুনের কোয়া বীজ হিসাবে রোপণ করা হয়।

পুষ্ট, নীরোগ ও বড় বড় কোয়া বীজ হিসাবে ব্যবহার করতে হবে। বিনা চাষে রসুনের কোয়া বোনার সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকলে জৈব সার ও রাসায়নিক সার এক সঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। এক-দু’দিন বাদে সারি থেকে সারি ছয় ইঞ্চি ও গাছ থেকে গাছ চার ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রেখে এক ইঞ্চি গভীরতায় রসুনের কোয়া বসাতে হয়। তার পর আচ্ছাদন হিসাবে কোয়াগুলি খড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

ফলে আগাছাদমন হবে এবং জলসেচ না দিলেও আশানুরূপ ফলন ঘরে তুলতে পারা যায়। এতে মাটির স্বাস্থ্যও ভাল থাকে। মূল জমিতে চাষ করে বীজ বপনের পর কোয়াগুলি খড়ের আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

প্রতি হেক্টরে জমিতে ৩০০-৩৫০ কেজি বীজ রসুনের প্রয়োজন হয়। অথবা কন্দের আকার অনুযায়ী বিঘা হিসেবে ধরলে বিঘা প্রতি ৫০-৭০ কিলোগ্রাম কোয়া বীজের দরকার।

রসুন চাষে মূল জমি তৈরির পদ্ধতি

জমি চাষ করে যেমন রসুন বোনা যায়, তেমন বিনা চাষেও রসুন বোনার প্রচলন আছে। তিন-চারটি চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিয়ে প্রথমে জমি আগাছামুক্ত করতে হবে। তার পর মই দিয়ে জমি সমান করে নিতে হবে। উপযুক্ত জলনিকাশি ব্যবস্থার জন্য ১০-১২ ফুট অন্তর নালা তৈরি করতে হবে।

রসূন চাষে সার প্রয়োগ

জমি তৈরির সময় বিঘা প্রতি ২৫-৩০ কুইন্টাল গোবরসার বা খামারসার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। রাসায়নিক সার হিসাবে বিঘা প্রতি পাঁচ কিলোগ্রাম নাইট্রোজেন, সাত কিলোগ্রাম ফসফেট, সাত কিলোগ্রাম পটাশ ও দেড় কিলোগ্রাম সোহাগা প্রয়োগ করতে হবে।

রসূন চাষের পরিচর্যার পদ্ধতি

জমিতে আগাছা দেখা দিলে হাতনিড়ানির সাহায্যে আগাছামুক্ত করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, গাছের শিকড়ে যেন কোনও আঘাত না লাগে। রসুনের কোয়া লাগানোর পরপরই জলসেচ দেওয়া যায়। তবে, মাটির প্রকৃতি অনুযায়ী ১০ থেকে ১৫ দিন অন্তর জলসেচ দিলেই চলে। রসুনের কন্দ পুষ্ট হওয়ার আগে পর্যন্ত জলসেচ বন্ধ করা যাবে না। কোয়া থেকে গাছ বার হওয়ার এক মাস পর চাপান হিসাবে পাঁচ কিলোগ্রাম নাইট্রোজেন মাটির সঙ্গে ভাল ভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। আগাছা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জলের ব্যবহার কমানোর জন্য কোয়া বীজ বোনার পর তা খড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

এটিও পড়ুন – পাট চাষ এর সঠিক পদ্ধতি

রসূন চাষে রোগ ও পোকা নিয়ন্ত্রণ

চসিপোকার আক্রমণ হলে পোকা পাতার রস খেয়ে পাতায় সাদা সাদা গোলাকার দাগ সৃষ্টি করে। পাতার ডগা বাদামি বর্ণ ধারণ করে ও শুকিয়ে যায়। প্রতিকার হিসাবে অ্যাসিফেট ০.১ শতাংশ অথবা ০.০২ শতাংশ ইমিডাক্লোরোপিডের স্প্রে করতে হবে। এর সঙ্গে স্টিকার মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। চসিপোকা ছাড়া অন্য কোনও পোকার উপদ্রব সে ভাবে দেখা যায় না রসুনে। ডাউনিমিলডিউ রোগের আক্রমণ দেখা যায়। ছত্রাকজনিত এই রোগে আক্রান্ত কোয়া থেকে যে গাছ বার হবে, তা বেঁটে এবং বিকৃত হয় এবং ধূসর-সবুজ রং ধারণ করে। মেঘলা ও স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় পাতায় জল বসার মতো ছত্রাক দেখা যায় এবং শুকনো আবহাওয়ায় পাতায় সাদা সাদা দাগ দেখতে পাওয়া যায়। পুরনো পাতা থেকেই এই লক্ষণ শুরু হয়। প্রতিকার হিসাবে রোগাক্রান্ত গাছে ম্যানকোজেন আড়াই গ্রাম প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে ১০ থেকে ১২ অন্তর স্প্রে করতে হবে। এগুলি ছাড়া রসুনে আর অন্য কোনও রোগ বিশেষ দেখা যায় না।

ফসল সংগ্রহের উপযুক্ত সময়

কোয়া লাগানোর সাড়ে তিন থেকে চার মাস বাদে রসুন বাজারজাত করার উপযুক্ত হয়। এছাড়া পাতার ডগা যখন হলদে-বাদামি হয়ে শুকোতে থাকবে, বাইরের দিকের কোয়াগুলি লম্বালম্বি ভাবে ফুলে উঠবে এবং দু’টি কোয়ার মধ্যে খাঁজ দেখা যাবে, তখনই বুঝতে হবে যে, রসুন তোলার উপযুক্ত হয়েছে। তখন গাছশুদ্ধ হাত দিয়ে টেনে তুলে মাটি ঝেড়ে পরিষ্কার করে চার-পাঁচ দিন ছায়ায় শুকোতে হবে। তার পর কাণ্ড থেকে কেটে রসুনের কন্দ আলাদা ভাবে সংগ্রহ করে বাজারজাত করতে হবে।

রসূন উপযুক্ত পরিচর্যা করলে এক বিঘা জমি থেকে সাত থেকে আট কুইন্টাল রসুন সহজেই পাওয়া যায়। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে রসুনের চাষে সাধারণত বিঘা প্রতি ১৫ থেকে ১৬ হাজার | টাকা অনায়াসেই আয় করা যায়।

ট্যাগ- রসুন চাষের সঠিক নিয়ম, রসুন চাষের সঠিক সময়, রসুন চাষের সঠিক সার প্রয়োগ। রসুন চাষের সঠিক

এগুলিও পড়তে পারেন -

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

four × 1 =

Back to top button