কৃষি

পাট চাষ এর সঠিক পদ্ধতি

লাভজনকভাবে পাট চাষ করার উপায়

পাট চাষ: পাট (Jute) একটি বর্ষাকালীন ফসল। বাংলাদেশে পাটকে সোনালী আঁশ  বলা হয়। পাটই বাংলার (বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের) শত বর্ষের ঐতিহ্য। পাট পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের একটি প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ও তন্তুু জাতীয় ফসল।

২০১১ সালের গণনা অনুসারে কোন দেশে কত পাট উৎপন্ন হয় তার সংক্ষিপ্ত তালিকা তুলে ধরা হল –

শীর্ষ দশ পাট উৎপাদনকারী দেশ
দেশ উৎপাদন (টনস)
ভারত ১,৯২৪,৩২৬
 বাংলাদেশ ১,৫২৩,৩২৫
 গণচীন ৪৩,৫০০
 উজবেকিস্তান ১৮,৯৩০
  নেপাল ১৪,৪১৮
 ভিয়েতনাম ৮,৩০৪
 মিয়ানমার ২,৫০৮
 জিম্বাবুয়ে ২,২৯৮
 থাইল্যান্ড ২,১৮৪
মিশর ২,১০০
 বিশ্ব ,৫৮৩,২৩৫

পাট চাষ এর সঠিক পদ্ধতি

সাধারণত পশ্চিমবঙ্গে দুটি শ্রেণির পাটের চাষ হয়। যথা-(১) মিঠা পাট বা বগীপাট, (২) তিতা পাট।

পাটের উন্নত, জাতগুলি হল –

  1. মিঠা পাট-
  •  বৈশাখী (J. R. O. 632),
  • গবীন (J. R. O. 524),
  • বাসুদেব (J. R. O. 7835),
  • চৈতালি (J. R. 0, 878) ইত্যাদি।

2. তিতা পাট-

  • সবুজ সােনা (J. R. C. 212),
  • সােনালি (J. R. C. 231 ),
  • শ্যামলি (J. R. C. 7447)।

জলবায়ু (Climate): পাট বর্ষাকালে আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় ভালাে হয়। পাট চাষের জন্য বছরে ৬০-৮০ সেমি, বৃষ্টিপাত প্রয়ােজন।

পাট

মাটি (Soil) : সামান্য ক্ষারযুক্ত যে-কোনাে মাটিতেই পাট চাষ করা যায়। তবে ভালাে ফলন ও উন্নত জাতের আঁশ পাওয়ার জন্য পলিযুক্ত উর্বর মাটি সবচেয়ে ভালাে। তবে কাদা দোআঁশ মাটি ও বেলে দোআঁশ মাটিতেও পাট চাষ করা যায়। সাধারণত উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে মিঠা পাট এবং উঁচু ও নীচু দু’রকম জমিতেই তিতা পাট চাষ করা যায়।

চাষ পদ্ধতি (Method of Cultivation):

জমি প্রস্তুতকরণ (Land preparation) : ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে কয়েক পশলা প্রাক মৌসুমি-বৃষ্টি হলে পাট চাষের জন্য জমিতে প্রথম কর্ষণ শুরু করতে হবে। পাট চাষের জন্য উপযুক্ত রসযুক্ত জমিকে গভীরভাবে ৪-৫ বার সােজাসুজি ও আড়াআড়িভাবে কর্ষণ করে মই দিয়ে মাটিকে বেশ ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। জমির সমস্ত আগাছা, আবর্জনা বেছে দিয়ে জমি পরিষ্কার করে নিতে হবে। জমি তৈরির সময় শেষ চাষের আগে পরিমাণমতাে গােবর সার প্রয়ােগ করে মাটির সঙ্গে ভালােভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। এছাড়া শেষ চাষের সময় প্রয়ােজনীয় রাসায়নিক সার (ফসফেট ও পটাশ) মূল সার হিসাবে প্রয়ােগ করতে হবে। জমিকে সমতল করে জলসেচ ও জলনিকাশের নালা তৈরি করতে হবে।

বীজবপন (Sowing of seeds) : পাটের বীজবপনের আগে বীজগুলি এগ্রোসান জি. এন, বা সেরেসান দিয়ে শােধন করে নিতে হবে।

পাটের বীজ সরাসরি জমিতে বপন করা হয়। সাধারণত মার্চ মাস থেকে মে মাসের মধ্যে পাটের বীজ বপন করা হয়। দুটি উপায়ে বীজবপন করা হয়। যেমন (ক) হাতে ছিটিয়ে, (খ) বীজবপন যন্ত্রের সাহায্যে। সারির দূরত্ব মিঠা পাটে ৯-১০ ইঞ্চি ও তিতা পাটে ১১-১২ ইঞ্চি। সারিতে দুটি চারার দূরত্ব ২-৩ ইঞ্চি রাখতে হবে।

সার প্রয়ােগ (Manuring) : পাটের ভালাে ফলন পেতে হলে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়ােগ করতে হবে। চাপান সার হিসাবে নাইট্রোজেনঘটিত সার প্রয়ােগ করতে হবে। পাটের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নাইট্রোজেনঘটিত সারের অর্ধেক মাটিতে প্রয়ােগ করে ও বাকি অর্ধেক ইউরিয়া দ্রবণের মাধ্যমে পাতায় স্প্রে করলে পাটের ফলন বৃদ্ধি পায়।

জলসেচ (Irrigation): সময়মতাে বৃষ্টি না-হলে সেচ দিয়ে জমি তৈরি করে। পাট বুনতে হবে। বীজ বোনার পর বর্ষা শুরু না-হলে ১৫-২০ দিন অন্তর প্রয়ােজনমতাে সেচ দিতে হবে।

জমিতে যাতে জল না-দাঁড়ায় সেই জনা জমি থেকে অতিরিক্ত জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

মাধ্যমিক পরিচর্যা (Interculture operation); পাটগাছ ছোট থাকা অবস্থায় কয়েকবার নিড়ানি দিয়ে মাটি আলগা করে দিতে হবে। এই সময় জমি থেকে আগাছা তুলে ফেলতে হবে। চারাগুলাে বেশি ঘন হলে, কিছু চারা তুলে পাতলা করে দিতে হবে মাঝে মাঝে কীটনাশক ওষুধ করে পােকা ও নোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হবে।

পাটের প্রধান কীটেশত হস- (ক) পাটের বিছেপােকা, (খ) ঘােড়াপােকা, (গ) কেড়িপােকা, (ঘ) লালা বা সাদা মাকড়।

পাট কাটা (Harvesting); পাট সাধারণত ৪/৫ মাসের মধ্যে কাটার উপযুক্ত হয়। সাধারণত নিম্নলিখিত তিনটি অবথায় পাট কাটা হয়ে থাকে। যেমন-

ফুল ফোটার সময়—এই অবস্থায় পাট কাটলে ফলন কম হয়, কিন্তু উন্নত মানের অশি পাওয়া যায়। (২) ফুল থেকে ফল ধরার সময়—এই অবস্থায় পাট কাটলে ফলন বেশি হয় এবং উন্নত মানের অশও পাওয়া যায়।

ফল পাকার সময়—এই অবস্থায় পাট কাটলে ফলন বেশি হয়, কিন্তু অশ মােটা ও কর্কশ হয়ে যায়।

সুতরাং দ্বিতীয় অবস্থায় পাট কাটা ভালাে।

সাধারণত কাস্তে বা হাঁসুয়া দিয়ে গাছের গােড়ায় পাট কাটা হয়। পাতা ঝরে যাওয়ার জন্য কাটা পাটগুলি জমিতে ফেলে রাখা হয়। এরপর ছােটো ছােটো আঁটি বেঁধে পচাবার জন্য জলাশয়ে আনা হয়।

পাট পচানাের ওপর পাটের আঁশের গুণ ও মান অনেকখানি নির্ভর করে। পাটের আঁটিগুলি জলে ডুবিয়ে রাখা হয়। সাধারণত 34° সে. ও তার বেশি বায়ু উষ্মতার দু- সপ্তাহের মধ্যে পাট পচে যায়। পাট ভালােভাবে পচে গেলে পাট কাঠি থে) আঁশ ছাড়িয়ে নিতে হবে। তারপর আঁশগুলাে পরিষ্কার জলে ভালােভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে দড়ির উপর বিছিয়ে রােদে শুকিয়ে নিতে হবে। ৩/৪ দিন ধরে রােদে শুকনাে হওয়ার পর অশি গাঁট বেঁধে সংরক্ষণ করা হয়।

পার্টের ব্যবহার (Uses of Jute) :

পাটের আঁশ থেকে চট, থলে, সুতলি, দড়ি, পাপােশ ইত্যাদি নানারকম জিনিস তৈরি করা হয়। ভালাে জাতের পাটতত্ত্ব থেকে কার্পেট, ব্যাগ ও ঘর সাজানাে জিনিস তৈরি করা হয়। পাটের সক্ষ্মত্তু দিয়ে বানা কাপড় বা পাটবস্ত্র আমাদের দেশে বহু প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাটের সূক্ষ্ম সুতাে অন্যান্য তন্তুর সাথে মিলিয়ে সিন্ধ ও কৃত্রিম কাপড় তৈরি হয়।

পাট থেকে সুন্দর সুন্দর পুতুল ও শৌখিন ব্যাগ প্রস্তুত করা হয়। বড়াে বড়াে হল ঘরের মেয়ে মুছবার জন্য ও ছােটো ছােটো ঝুল ঝাড়া বা ঝাড়ন পাটের তত্ত্ব থেকে তৈরি করা হয়।

পাটকাঠি জ্বালানি হিসাবে, বেড়া দেওয়া বা ঘর ছাওয়ার কাজে, পানের বরােজে ও কাগজ তৈরির কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

এটিও পড়ুন – বাড়ির প্রত্যক দিনের কিছু টুকিটাকি টোটকা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button