videosপত্র রচনা

একটি বই পড়ে তােমার ভালাে লেগেছে। কেন ভালাে লেগেছে, তার কারণ জানিয়ে বন্ধুর একটি পত্র

একটি বই পড়ে তােমার ভালাে লেগেছে। কেন ভালাে লেগেছে, তার কারণ জানিয়ে বন্ধুর কাছে একটি পত্র লেখাে। এটিও পড়ুন – তােমার এলাকার হাসপাতালের দুরবস্থা কথা জানিয়ে সভাপতিকে পত্র

প্রিয় কমল,

এক একটি বই পড়ার অভিজ্ঞতাও যে জীবনের পরম সম্পদ হয়ে উঠতে পারে সম্প্রতি আমি তা বুঝতে পেরেছি। সেকথা জানাবার জন্যই আজ তােমাকে চিঠি লিখতে বসা।

তুমি তাে জানাে, আমাদের উচ্চমাধ্যমিক বাংলা সংকলন গ্রন্থে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আরণ্যক নামে একটি গদ্যাংশ আছে। আমাদের বাংলার স্যার প্রসাদবাবু সেদিন পড়াচ্ছিলেন এটি। তিনি জানালেন, আরণ্যক’ নামের এই রচনাটি বিভূতিভূষণের স্বতন্ত্র কোনাে রচনা নয়। ‘আরণ্যক’ নামে তার একটি বিখ্যাত উপন্যাস আছে। সেই উপন্যাসের একাদশ পরিচ্ছেদ থেকে এই অংশটি সংকলন করা হয়েছে। সংকলনকালে উপন্যাসের নামটিকেই শিরােনাম হিসেবে জুড়ে দিয়েছেন সংকলক। ক্লাসের শেষে তিনি আমাদের বলেছিলেন, পারলে উপন্যাসটি পড়ে নিয়াে।

স্যারের কথায় ‘আরণ্যক উপন্যাসটি পড়বার জন্য মনে মনে আগ্রহী হয়ে উঠলাম। সেদিনই লাইব্রেরি থেকে বাড়ি নিয়ে গেলাম বইটি। সত্যি কথা বলছি, আরণ্যক পড়তে পড়তে আমি সম্পূর্ণ অন্য জগতে চলে গিয়েছিলাম। বইটি যে আমার কতখানি ভালাে লেগেছে তা তােমাকে ঠিক বলে বােঝাতে পারব না। উপন্যাসের কথক সত্যচরণ। সে কলকাতা থেকে গেছে বিহারের পূর্ণিয়া জেলার জঞ্জাল মহালের বিলি-বন্দোবস্তের দায়িত্ব নিয়ে। অরণ্যের নির্জনতা প্রথম প্রথম তাকে অস্বস্তিতে ফেললেও ক্রমে অরণ্যপ্রকৃতি তাকে অভিভূত করে। আরণ্যক জীবনের সঙ্গে নিবিড় যােগ অনুভব করে সে। সৌন্দর্যপিপাসু সত্যচরণের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বিচিত্র আরণ্যক রূপ। অরণ্যের দিন-রাত্রি যেন কোন্ জাদুবলে আচ্ছন্ন করে তার সমগ্র অস্তিত্বকে। আর আমিও একটু একটু সত্যচরণের সঙ্গী হয়ে উঠি মনে মনে। সত্যচরণের মতাে আমার চোখের সামনেও ফুটে ওঠে ভাগলপুর-পূর্ণিয়া অঞ্চলের বিস্তৃত অরণ্যভূমি। লবটুলিয়া, ফুলকিয়া, নাঢ়া বইহার, বােমাইবুরুএইসব অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানাের অভিজ্ঞতার স্বাদ পাই আমিও।

অরণ্যের রুদ্ররূপ যেমন আছে, তেমনি আছে তার রােম্যান্টিক আবেদন। আরণ্যক উপন্যাসে এই দুইয়েরই অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছে সত্যচরণ। কখনও দহনতীব্র জ্যৈষ্ঠদুপুরের ভয়ংকরতা, কখনও জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাত্রির মায়ামমতা – কোনােটারই আকর্ষণ কম নয়। অরণ্য-জ্যোৎস্না যে কত অপরূপ, কত রহস্যময় হয়ে উঠতে পারে, এই উপন্যাস না পড়লে তা জানতে পারতাম না। প্রকৃতিবর্ণনা তাে আছেই, সেইসঙ্গে প্রকৃতিলালিত মানবজীবনেরও বিচিত্র পরিচয় বিধৃত হয়ে আছে এই গ্রন্থে। কত অদ্ভুত সব মানুষ! যুগলপ্রসাদ, রাজু পাড়ে, মটুকনাথ, কুতা, মঞ্জী—এরকম বহু চরিত্রের সাক্ষাৎ পাই এই উপন্যাসে। আর আমাদের পাঠ্য অংশে পড়া ভানুমতীকে পেলাম আরও বেশি করে। তবু সব মিলিয়ে এই উপন্যাসের নায়িকা যদি কেউ থাকে তবে সে আর কেউ নয়, সে হল এই বিস্তৃত বনভূমি।

এই বইয়ের আর একটি বড় আকর্ষণ এর ভাষা। শব্দ নির্বাচন এবং প্রকাশভঙ্গি এমন চমৎকার যে, বিভূতিভূষণের এই গদ্যভাষাও আমার কাছে মাঝে মাঝে কবিতার মতাে মনে হয়। আরণ্যক’-এর আঙ্গিকটিও একটু অন্যরকম। ধারাবাহিক কোনাে কাহিনি বর্ণনা নয়, অনেকটা ডায়ারির মতাে মনে হয় এটিকে। এ যেন এক অরণ্যপ্রেমিক দরদি মানুষের লেখা অরণ্যবাসের দিনলিপি।

যাক, বইটি সম্পর্কে বেশি বলা অপেক্ষা বরং তােমাকে বইটি পড়ে নেবার কথাই বলি। এর মধ্যে যদি না পড়ে থাকে তাহলে অবশ্যই পড়ে নিয়াে। আর যদি পড়া হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তুমিও তােমার উপলব্ধির কথা জানিয়াে।

তুমি আমার ভালােবাসা নিয়ো।

ইতি

তােমার প্রীতিমুগ্ধ

বিমল

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button