প্রবন্ধ রচনাজীবনী

সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রবন্ধ রচনা

বিজ্ঞান তাপস সত্যেন্দ্রনাথ বসু, Satyendra Nath Bose

সত্যেন্দ্রনাথ বসুঃ এই পোষ্টে বিজ্ঞান তাপস সত্যেন্দ্রনাথ বসু সম্পর্কে প্রবন্ধ রচনা শেয়ার করা হল। এই প্রবন্ধ অনুসারে যে সকল প্রবন্ধ রচনা লেখা যাবে তা হল – একজন বাঙালী বিজ্ঞানী, প্রাণচঞ্চল জ্ঞানান্বেষী সত্যেন্দ্রনাথ ; তােমার প্রিয় জীবনী ইত্যাদি।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রবন্ধ রচনা

[ প্রসঙ্গসূত্রঃ ভূমিকা; জন্ম, বংশ-পরিচয় ও ছাত্রজীবন ; কর্মজীবন; কোয়ান্টামতত্ত্ব ও সত্যেন্দ্রনাথ; বিশ্বজয় ও খ্যাতিময় কর্মজীবন; ছাত্রপ্রীতি ও মাতৃভাষা প্রীতি; সাহিত্য-চর্চা; প্রাসঙ্গিকতা ; উপসংহার।]

এক এক করে একশােটি জীবনবর্ষ অতিক্রম করে বাঙালী বিজ্ঞানী শতবর্ষ পূর্ণ করলেন। বিজ্ঞানে হ্যা, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কথা বলছি। বিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ভূমিকাঃ

সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন মনেপ্রাণে একজন খাটি বাঙালী, যার নাম বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সঙ্গে উচ্চারিত। এত খ্যাতি, তবু ছিল না তার পােশাকী আবরণ বা অহঙ্কার। মজলিসী মানুষ। তার গৃহের সাহিত্য-সংস্কৃতির সান্ধ্যবাসরে মুখরােচক জলযােগও বাদ যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি বন্ধু দিলীপ রায়ের গানে ডুবে যান, জ্যোৎস্নারাতে এসরাজে আনেন। তিনি অপূর্ব সুরঝঙ্কার! বয়স্কশিক্ষা, নৈশ বিদ্যালয় প্রভৃতি সমাজসেবায় যার অক্লান্ত উৎসাহ, ভূমিকা পশু-পাখিও তার অগাধ ভালবাসা থেকে বঞ্চিত নয়। যাকে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বপরিচয় গ্রন্থখানি উৎসর্গ করেছেন, তাকেই ছাত্রজীবনে হিন্দু স্কুলের এন্ট্রান্স পরীক্ষার টেস্টে গণিতশিক্ষক উপেন্দ্রনাথ বক্সী অবিশ্বাস্যভাবে ১০০-র মধ্যে ১১০ দিয়েছেন। আর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় বিদেশী অধ্যাপক ও প্রধান পরীক্ষক পার্সিভাল তার উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেছেন, “This boy is a genius.’ এই আশ্চর্য ছাত্রটি পরবর্তী জীবনে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান-চর্চার জন্য দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, “যারা বলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান-চ্চা সম্ভব নয়, তারা হয় বাংলা জানেন না, নয় বিজ্ঞান জানেন না। তিনি ইংরেজ যুগের দাস-মনােভাব কাটাতে স্নাতকোত্তর বিজ্ঞান স্তরে বাংলাতেই বিজ্ঞান পড়িয়েছেন।

বংশ পরিচয় ও ছাত্র জীবন

এই কিংবদন্তীসুলভ মানুষটির জন্ম ১৮৯৪ খ্রীস্টাব্দের ১লা জানুয়ারি উত্তর কলকাতার গােয়াবাগান অঞ্চলে। নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু। বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ বসু। মা আমােদিনী দেবী। মা-বাবার একমাত্র সন্তান সত্যেন্দ্রনাথ নর্মাল স্কুলের পর হিন্দু স্কুলে ভর্তি হন। ১৯০৯ খ্রীস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-পরিচালিত এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। ১৯১১ খ্রীস্টাব্দে এফ. এ. পরীক্ষায় প্রথম স্থান এবং ১৯১৩ খ্রীস্টাব্দে স্নাতক পরীক্ষায় গণিতে অনার্সসহ প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দে স্নাতকোত্তর মিশ্রগণিত পরীক্ষাতেও প্রথম স্থানটি তারই অধিকারে থাকে।

কর্মজীবন ও গবেষণা

বাংলা তথা ভারতের এই কৃতী ছাত্রটিরও চাকরির সন্ধানে দুটি বছর যায়। ১৯১৭ খ্রীস্টাব্দে স্যার আশুতােষ মুখােপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবগঠিত বিজ্ঞান কলেজে পদার্থবিদ্যা ও মিশ্ৰগণিতের অধ্যাপকরূপে যােগ দেন। ১৯২১ খ্রীস্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার রীডার হন। ক্রমে হন ঐ বিভাগের প্রধান। সেখান থেকে একখানা ছ-পাতার গবেষণামূলক প্রবন্ধ তিনি আইনস্টাইনের কাছে পাঠান। ১৯২৪ খ্রীস্টাব্দের জুন মাসে সেই প্রবন্ধটির মৌলিকতায় গভীরভাবে অভিভূত হন জার্মান বিজ্ঞানী  আইনস্টাইন। তা থেকেই হয় ‘বােস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন। ১৯০০ খ্রীস্টাব্দে জার্মান বিজ্ঞানী প্ল্যাঙ্ক কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণে শক্তির পরিমাপ সম্পর্কে যে সূত্র দেন, সেই সূত্রের প্রতিষ্ঠায় আইনস্টাইনীয় ব্যাখ্যায় কিছু বিচ্যুতি ছিল।

এটিও পড়ুন – প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ প্রবন্ধ রচনা

কোয়ান্টামতত্ত্ব ও সত্যেন্দ্রনাথ

বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ মৌলিকতার সূত্রে প্ল্যাঙ্কের সূত্রটিকে সুসংবদ্ধ করেন। তার ভাবনার আলােকে আইনস্টাইন একক পরমাণুসম্পন্ন কোয়ান্টাম্বাদ গড়ে তােলেন। সারা বিশ্ব বিস্মিত হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থানুকূল্যে সত্যেন্দ্রনাথ ১৯২৪ খ্রীস্টাব্দে ইউরােপ যাত্রা করেন। ফ্রান্স হয়ে যান জার্মানী। আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ আলাপ হয়। বিজ্ঞানী প্ল্যাঙ্ক তরুণ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথকে দেখে শ্রদ্ধাবিহুল কণ্ঠে বলেন, ‘you are only thirty!”

বিশ্বজয় ও খ্যাতিময় কর্মজীবন

বিশ্ববিজয়ের পর দেশে ফিরে এলে জড় হয় একের পর এক খ্যাতির মালা। ১৯২৯ খ্রীস্টাব্দে হন ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে পদার্থবিজ্ঞান শাখার সভাপতি। ১৯৪৫ খ্রীস্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান হয়ে আসেন। এই বছরই তিনি আইনস্টাইনের নতুন ক্ষেত্রতত্ত্বের ওপর কাজ শুরু করে ১৯৫২ খ্রীস্টাব্দে সহজ পদ্ধতিতে ঐ তত্ত্বের সম্পূর্ণতা দান করেন। জীববিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা এবং রসায়নের ওপরও তিনি আলােকপাত করেছেন। ১৯৫৪ খ্রীস্টাব্দে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মবিভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৫৭ খ্রীস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৫৮-তে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডক্টরেট উপাধিতে সহ হন। ভারত সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক রূপে নির্বাচিত করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ খ্রীস্টাব্দ অবধি তিনি বিশ্বভারতীর উপাচার্যের পদ অলঙ্কৃত করেন।

ছাত্রপ্রীতি ও মাতৃভাষাপ্রীতি

আদর্শ শিক্ষাব্রতী বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আদর্শে ত সত্যেন্দ্রনাথ আজীবন ছাত্রদের গভীরভাবে ভালােবাসতেন। পড়াতে গিয়ে তিনি অনুভব করেন বিদেশী ভাষার বেড়া ডিঙাতে বহু ছাত্রছাত্রী নাকাল হচ্ছে; স্তিমিত হচ্ছে তাদের উদ্যম ও প্রাণশক্তি। মনে পড়ে ১৩১১ বঙ্গাব্দের ১৭ই চৈত্র ক্লাসিক মঞ্চে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষার্থীদের অভ্যর্থনা জানানাের জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আয়ােজিত সভায় রবীন্দ্রনাথ ‘ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণে বলেন, ‘…গৃহবাতায়ন হইতে স্বহস্তজ্বালিত সন্ধ্যাদীপটি চোখে পড়িবে না? যদি পড়ে তবে কি অবজ্ঞা করিয়া বলিব ওটা মাটির প্রদীপ ? …মাতার কক্ষে সােনার প্রদীপ গড়িয়া দিতে কে বাধা দিয়াছে ? সত্যেন্দ্রনাথ তখন বছর দশেকের বালক। কিন্তু পরবর্তী জীবনে সেই নাবালকটি মাতার কক্ষে সােনার প্রদীপ তৈরি করতে ব্রতী হয়েছেন। তাই তিনি বারংবার বলেছেন, ‘দেশের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য সর্বস্তরে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ছাড়া গত্যন্তর নাই। ছাত্রজীবনে তিনি হাতে লেখা পত্রিকা ‘মনীষা সম্পাদনা করেছেন।

সাহিত্য-চর্চা

১৯১৬ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বরে বন্ধু হারীকৃষ্ণ দেবের মধ্যস্থতায় এবং প্রমথ চৌধুরীর একান্ত আগ্রহে সবুজপত্র’-এর আসরে যােগ দেন। বিচিত্রা-র আসরেও তিনি উপস্থিত থাকতেন। পরিচ পত্রিকার সঙ্গেও ছিল তার নাড়ীর টান। সমালােচক নীরেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন তার সম্পর্কে ভাই এবং পরম সুহৃদ। নীরেন্দ্রনাথ তাই সারা জীবনের সঞ্চয় বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদকে দান করেন। ঢাকায় থাকাকালীন ‘বিজ্ঞান পরিচয়’ প্রকাশ, কলকাতায় বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ প্রতিষ্ঠা এবং তার মুখপত্র জ্ঞান ও বিজ্ঞান’-এর প্রকাশনায় তিনি ব্রতী হন। তারই উৎসাহে বাংলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞানের অভিধান ‘বিজ্ঞান ভারতী’ রচনা করেন দেবেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। লােকশিক্ষার প্রয়ােজনে ঐ গ্রন্থের মূল্য অপরিসীম।

১৯৭৪-এর ৪ঠা ফেব্রুয়ারি এই জ্ঞান সাধকের মহাপ্রয়াণ ঘটে। এর মাত্র কিছুদিন পূর্বে হয়েছে বসু-সংখ্যায়ন-এর পঞ্চাশ বর্ষ পূর্তি উৎসব। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে যে শুভ্রভাস মানুষটি হাসি-গল্পে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন, মৃত্যু যে তাকে এমন অকস্মাৎ ছিনিয়ে নেবে, কে তা ভেবেছিল।

প্রাসঙ্গিকতা

নিত্যনতুন গবেষণা ও আবিষ্কারে পুরাতন ধ্যান-ধারণা ভ্রান্ত হয়ে যায়, সূত্র বদল হয়। বােস সংখ্যায়ন এবং ফার্মি সংখ্যায়ন তত্ত্ব আজও অমলিন। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, কণা সম্বন্ধে ভবিষ্যতেও এই তত্ত্ব দুটিকে ভিত্তি করে গবেষণার কাজ চালাতে হবে। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা চালু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ স্তরে ও গবেষণায় মাতৃভাষা ব্যবহারে আপত্তি নেই। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে বিজ্ঞান ও কারিগরী শাখায় মাতৃভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু কিছু সরকারী কাজ মাতৃভাষায় হলেও বিদেশী ভাষা এখনাে উঠে যায়নি। শতবর্ষে তার ইচ্ছা ও আরব্ধ রূপায়ণের চেষ্টা বাঞ্ছনীয়।

উপসংহার

রসে বশে প্রাণচঞ্চল এই জ্ঞানতপস্বী ছিলেন শিশুর মত সরল, ছাত্রদরদী, আবার জার্মান-ফরাসী ভাষাতেও অভিজ্ঞ। মানুষটি নীতিবোেধ ও নির্লোভয় ছিলেন তুলনাহীন। তাই একদা এম. এস-সি. পরীক্ষা পিছানাের দাবিতে ছাত্রনেতারা উত্তাল হলেও তিনি নীতি থেকে একচুল সরে আসেননি। জার্মানীতে বিশাল অঙ্কের লােভনীয় চাকরিও তাকে প্রলুব্ধ করেনি। দেশের বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ এবং কৃতী ছাত্রছাত্রীরা যদি এই বিরল বিজ্ঞানসাধকের জীবনের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় তবে দেশ ও জাতির অধিকতর মঙ্গল সাধিত হবে। সত্যেন্দ্রনাথের নীতি ও আদর্শের প্রতি বিশ্বাস, তাঁর আরন্ধ কাজের রূপায়ণ হােক, এই আমাদের শতবার্ষিকীর সঙ্কল্প।

এটিও প্রুন – বইমেলা প্রবন্ধ রচনা 700 শব্দের মধ্যে

ট্যাগঃ সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রবন্ধ রচনা, জীবনী সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রবন্ধ রচনা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button