উৎসবপ্রবন্ধ রচনা

মহরম প্রবন্ধ রচনা 700 শব্দের মধ্যে বা মুহর্‌ম – Muharram

মহরম কী? কেন মহরম পালন করা হয়? মুহর্‌ম সম্পর্কে বিস্তারিত

মুহররম বা মহরম (Muharram) হলো ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। চারটি পবিত্রতম মাসের মধ্যে এটি একটি। মুহররম শব্দটি আরবী যার অর্থ পবিত্র, সম্মানিত। প্রাচীনকাল থেকে মুহররম মাস পবিত্র হিসাবে গণ্য। মহররমের ১০ তারিখ বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন দিন, যাকে আশুরা বলা হয়ে থাকে। বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষি এই মাসটি । মহররম মাসের পরবর্তি মাসের নাম সফর।

মহরম

ভূমিকাঃ  ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহম্মদ (দঃ)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রাঃ) পবিত্র ইসলাম ধর্মের জন্য কারবালা প্রান্তরে আত্মােৎসর্গ করিয়াছিলেন। এই বিষাদময় স্মৃতিকে স্মরণ করিয়া মুসলমানগণ প্রতি বৎসর মুহররম মাসের ১০ই তারিখে যে শােকব্রত পালন করে, তাহাই মুহম নামে খ্যাত।

সংশ্লিষ্ট ইতিহাস ও ইসলামের ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। হযরত মুহম্মদ (দঃ)-এর মৃত্যুর পর তাহার চারি জন প্রধান শিষ্য ক্রমান্বয়ে মুসলমানগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইয়া খলিফা নিযুক্ত হন। প্রথমত, হযরত আবুবকর (রাঃ), তাহার মৃত্যুর পর হযরত উমর (রাঃ), তাহার মৃত্যুর পর হযরত উসমান (রাঃ) এবং তাহার মৃত্যুর পর হযরত আলী (রাঃ) খলিয়া পদ অলংকৃত করেন।

হযরত আলী (রাঃ) মদীনায় মুসলমানগণ কর্তৃক খলিফা মনােনীত হইলেও সিরিয়ার শাসনকর্তা মুআবিয়া তাহাকে (আলীকে) খলিফা বলিয়া স্বীকার করিলেন না। তিনি ছিলেন অতিশয় উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ক্ষমতাপ্রিয়। তিনি নিজেই খলিফা হইবার আশা মনে পােষণ করিতেন। তাই তিনি হযরত আলী (রাঃ)-র প্রধান শত্ৰু হইয়া দাড়াইলেন। তিনি বিদ্রোহীদের হস্তে নিহত খলিফা উসমান (রাঃ)-এর হত্যাকাণ্ডে পরােক্ষভাবে হযরত আলী (রাঃ)-কে অনর্থক দায়ী করিয়া তাহার সহিত যুদ্ধ করিলেন। মু’আবিয়া তাহার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জানিয়া সন্ধি প্রার্থনা করিলেন এবং কূটনীতির সাহায্য লইলেন। মু’আবিয়ার মন্ত্রীর কৌশলক্রমে এই শর্তে একটি সন্ধিপত্র লিপিবদ্ধ হইল যে হযরত আলী (রাঃ)-র মৃত্যুর পর মু’আবিয়া খলিফা পদ লাভ করিবেন এবং মু’আবিয়ার মৃত্যুর পর হযরত আলী (রাঃ)-র জ্যেষ্ঠপুত্র হযরত হাসান (রাঃ) খিলাফত প্রাপ্ত হইবেন।

ইহার কিছুদিন পর মু’আবিয়ার ষড়যন্ত্রে একদা কুফার মসজিদে উপাসনারত অবস্থায় হযরত আলী রাঃ) ইবনে মুল্যম নামক জনৈক খারিজী গুপ্তঘাতকের হস্তে নিহত হইলেন। মদীনাবাসিগণ মু’আবিয়ার এই হীন ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে হযরত আলী (রাঃ) -র জ্যেষ্ঠপুত্র হযরত হাসান (রাঃ)-কে খলিফা বলিয়া ঘােষণা করিলেন। নব নিযুক্ত খলিফা সিংহাসনে বসিয়া রাজ্যে শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিবার পূর্বেই মু’আবিয়া তাহার বিরুদ্ধে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। হাসান (রাঃ) মু’আবিয়ার সৈন্যদলকে প্রতিরােধ করিবার জন্য প্রথমে যত্নবান হন। কিন্তু শান্তিপ্রিয় ইমাম হাসান (রাঃ) আর রক্ত প্রবাহিত করিতে সম্মত না হইয়া মু’আবিয়ার সহিত সন্ধি করিলেন। সন্ধির শর্তানুসারে ইমাম হাসান (রাঃ) খলিফার পদ ত্যাগ করিলেন, মু’আবিয়া খলিফা হইলেন এবং তাহার মৃত্যুর পর ইমাম হাসান (রাঃ) পুনরায় খলিফা হইবেন স্থির হইল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মু’আবিয়ার মন্ত্রী মারােয়ানের কূটচক্রে বিষ-প্রয়ােগে হযরত হাসান (রাঃ)-এর জীবনলীলা সাঙ্গ হইল।

ইতােমধ্যে মু’আবিয়ার মৃত্যু হইল। সন্ধির শর্তানুযায়ী ইমাম হাসান (রাঃ)-এর অনুজ ইমাম হুসাইন (রাঃ) খিলাফত দাবি করিলে মক্কা ও মদীনার লােকেরা এক – বাক্যে তাঁহাকে খলিফা বলিয়া মানিয়া লইলেন। ওদিকে মু’আবিয়ার পুত্র ইয়াযীদ পিতৃকৃত সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করিয়া নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা বলিয়া ঘােষণা করিলেন।

কুফার অধিবাসিগণ ইয়াযীদের অত্যাচারে বিরক্ত হইয়া গােপনে ইমাম হুসাইন (রাঃ)-কে সংবাদ পাঠাইলেন যে ইমাম হুসাইন (রাঃ) কুফায় পদার্পণ করিলে তথাকার অধিবাসিগণ তাহার পক্ষ অবলম্বন করিয়া ইয়াযীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিবে। গুপ্তচর মুখে ইয়াযীদ কুফার অধিবাসিগণের এই অভিপ্রায় পূর্বেই অবগত হইয়াছিলেন। তিনি কুফার শাসনকর্তা উবায়দুল্লাহ যেয়াদকে প্রলােভনে ভুলাইয়া স্বীয় দলে লইলেন।

হুসাইন (রাঃ)-এর কুফা যাত্রাঃ  কুফাবাসিগণের আমন্ত্রণ পাইয়া হুসাইন (রাঃ) প্রসন্ন হৃদয়ে কুফা অভিমুখে সপরিবারে যাত্রা করিলেন। কিন্তু দৈবক্রমে মরুভূমিতে দিভ্রান্ত হইয়া ইরাকের প্রান্তসীমায় ইউফ্রেটিস (ফোরাত নদী) তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে উপনীত হইলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া হুসাইন (রাঃ) দেখিতে পাইলেন ফোরাত নদীর কূল ইয়াযীদের সৈন্যদল কর্তৃক পরিবেষ্টিত। শত্রু সেনাপতি ইমাম হুসাইন (রাঃ)-কে বলিয়া পাঠাইল-এখনই ইয়াযীদের বশ্যতা স্বীকার করুন। ধর্মভীরু হুসাইন (রাঃ) ইয়াযীদের চরিত্র স্মরণ করিয়া তাহাতে অস্বীকৃত হইলেন। ইয়াযীদের সেনাপতি নদীর দুই তীরে সৈন্য সমাবেশ করিয়া ইমাম হুসাইন (রাঃ)- এর পানি সংগ্রহের পথ রুদ্ধ করিয়া দিল। অচিরেই ইমামের শিবিরে পানি-কষ্ট উপস্থিত হল। পিপাসার্ত শিশুগণ পানি বিহনে ওষ্ঠাগত প্রাণ হইয়া উঠিল, পরিজরোও ভূমিতে অবলুষ্ঠিত হইয়া পড়িলেন।

যুদ্ধঃ  হুসাইন (রাঃ) আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। পরম বিক্রমে শত্রু সৈন্যের মােকাবিলা করিলেন। তাহার পুত্র আলী আকবর ও ভ্রাতৃপুত্র কাসেম এবং অন্যান্য সঙ্গিণণ ইয়াযীদের অগণিত সৈন্যের সহিত যুদ্ধ করিয়া শহীদ হইলেন। অতঃপর স্বয়ং মহাবীর হুসাইন (রাঃ) রণক্ষেত্রে আবির্ভূত হইলেন। তিনি একাকী বহু শত্রুসৈন্য নিহত করিয়া অবশেষে অবসন্ন দেহে মাটিতে লুটাইয়া পড়িলেন। অমনি ইয়াযীদের নির্মম সেনাপতি সীমার তাহার পবিত্র বক্ষস্থলে বসিয়া পড়িল এবং খঞ্জর দ্বারা তাহার কণ্ঠদেশে আঘাত করিয়া মস্তক ছিন্ন করিল।

অনুষ্ঠান পদ্ধতিঃ কারবালা প্রান্তরের এই বেদনাকরুণ কাহিনীকে স্মরণ করিয়াই মুসলমানগণ প্রতি বৎসর মুহরূম মাসে শােক-উৎসব পালন করে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রকারে মুহররম পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের দেশে নিম্নলিখিত প্রকারে এই পর্ব অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। কারবালায় ইমামের কবরের উপর যে স্মৃতিচিহ্ন নির্মিত হইয়াছিল তাহারই অনুকরণে তাজীয়া নির্মাণ করিয়া শিয়া মুসলমানগণ ইমামবাড়ার নিকট উহা স্থাপন করে। তাজীয়ার পশ্চাদ্ভাগে ইমাম সাহেবের শেষ পরিচ্ছদের চিহ্নস্বরূপ স্বর্ণমুকুট, তরবারি, ঢাল, তীর ও ধনুক রাখা হয়। ইহাছাড়া তাম্র বা পিতল নির্মিত আলম এবং পাঞ্জা প্রাচীরগাত্র সংলগ্ন করা হয়। এই উপলক্ষে শিয়া মুসলমানগণ রজনীতে বুক চাপড়াইয়া মাতম’ অনুষ্ঠান পালন করিয়া থাকে এবং সুন্নী মুসলমানগণ যুদ্ধের অনুকরণে লাঠি ও তরবারির নানারূপ কৌশল প্রদর্শন করে। সপ্তম দিবসে রাজপথে আড়ম্বরের সহিত উপরিউল্লিখিত আলম এবং পাঞ্জা বাহির করা হয়। নবম দিবসে সন্ধ্যাকালে শােভাযাত্রা বাহির হয়। দশম দিবসে তাজিয়া ও আলম প্রভৃতি মৃত্তিকা মধ্যে প্রােথিত করা হয়।

উপসংহারঃ অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে মােকাবিলা করিয়া কিভাবে মানুষ সত্যের জন্য আত্মদান করিতে পারে ইমাম হুসাইন (রাঃ) স্বীয় জীবন বিসর্জন দিয়া পৃথিবীতে সেই আদর্শই রাখিয়া গিয়াছেন। ভয়াবহ ও বিশাল মরুপ্রান্তরে পিপাসার্ত শুষ্ক কণ্ঠ ভয়ার্ত স্বজন ও অনুচরবর্গের একে একে প্রাণত্যাগের মধ্যে ইমাম হুসাইন (রাঃ) যে সহিষ্ণুতা, ত্যাগ ও মনুষ্যত্ব-মহিমা দেখাইয়াছেন, তাহা জগতের ইতিহাসে অতুলনীয়। তাহার আত্মত্যাগে পৃথিবীর মানুষ যে মহান শিক্ষা লাভ করে, তাহার জন্য মুহররম কাহিনীকে তাহারা চিরদিন শ্রদ্ধা ও ভক্তি-আনত শিরে ক্বরণ করিবে।

সোর্স – ইন্টারনেট

এটিও পড়ুন – ৫ টি প্যারাগ্রাফ শিখলেই লিখতে পারবেন ১২৭ টি প্যারাগ্রাফ

ত্যাগঃ মহরম রচনা, মহরম প্রবন্ধ রচনা, মহরম প্রবন্ধ রচনা PDF সহ, মহরম সম্পর্কে জানা অজানা, মহরম কী এবং কেন? মহরম সম্পর্কে বিস্তারিত, মহরম কেন পালন করা হয়। কবে থেকে মহরম প্রচলিত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button