স্বাস্থ্য

বর্ষাকালে রােগ ব্যাধি থেকে নিজেকে বাঁচাবেন যেভাবে

বর্ষাকালে নানা রােগের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর গোপন তথ্য

বর্ষাকালে রােগ ব্যাধি থেকে নিজেকে বাঁচাবেন যেভাবে এই নিয়ে আজকের এই পোষ্ট, করান বর্ষা কালে আমাদের নানান রোগে আক্রান্ত করে। কিন্তু একটু সতর্ক ও কিছু নিয়ম কানুন মেনে চললে বর্ষাকালে বেশ তরতাজা এবং সুস্থ্য থাকা যায়। বর্ষাকালে রােগ ব্যাধি থেকে নিজে বাঁচানোর কিছু টিপস এই পোষ্টে শেয়ার করা হল।

বর্ষাকালে রােগ ব্যাধি থেকে নিজেকে বাঁচাবেন যেভাবে

বর্ষার সময় গ্রাম বাংলাতাে বটেই, এমনকি শহরেও শুদ্ধ পানীয় জলের অভাব দেখা দেয়। গ্রামের খাল, বিল ও পুকুর বর্ষায় প্লাবিত হয়, এমনকি কুয়াের জলও দূষিত হয়। তখন একমাত্র ভরসা টিউওয়েলের জল। শহরের বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা থাকলেও, বর্ষার সময় রাস্তার জমা জলের সঙ্গে পানীয় জল মিশে যায়। অনেক সময় জলের পাইপে ফুটো থাকে, বর্ষার জমা জল রাস্তা থেকে ঘরেও ঢুকে পড়ে এবং বাসিন্দারা অসুখে আক্রান্ত হন। এই অবস্থায় যে যে অসুখ হতে পারে এবার সে সম্পর্কে আলােচনা করা যাক।

এটিও পড়ুন – স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় প্রয়ােজনীয় কথা সকলের জানা উচিত

আন্ত্রিক: আন্ত্রিক কোনও বিশেষ অসুখের নাম নয়, রােগ জীবাণুর সংক্রমণের ফলে অন্ত্র বা intestine-এর সংক্রমণকে আন্ত্রিক বলা হয়। দৈনিক তিন বা তার বেশি তরল মলত্যাগকে পেটের অসুখ বা আন্ত্রিক বলা হয়। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা প্রটোজোয়ার আক্রমণে আন্ত্রিক হতে পারে।

ভাইরাসের কারণে আস্ত্রিক:

  • রােটা ভাইরাস শিশুদের বেশি হয়, বিশেষ করে অপুষ্টি বা রক্তাল্পতা থাকলে। প্যারা ভাইরাস বয়স্কদের বেশি হয়।
  • ইকো ভাইরাসখােলস সমেত দূষিত মাছের থেকে এর সংক্রমণ হয়।
  • কক্সকিভাইরাস।
  • অ্যাডিনাে ভাইরাস।
  • এইডস ভাইরাস।

ভাইরাসের কারণে আন্ত্রিকের চিকিৎসা ও আর এস দিয়েই করা হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে শিরায় স্যালাইন দেওয়া হয়।

• ব্যাকটিরিয়া • সালমােনিলা • শিগেলা • ইকোলাই

ব্যাকটিরিয়ার কারণে আন্ত্রিকের চিকিৎসায় মুখে ও আর এস এবং শিরায় স্যালাইন দেওয়া হয়। প্রয়ােজনে অ্যান্টিবায়োটিক হিসাবে অ্যাম্পিসিলিন, কোট্রামঙ্গোজল, সিপ্রয়ক্সাসিন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।

কলেরাঃ ভিব্রিও কলেরি নামক এক জীবাণুর সংক্রমণে এই রােগ হয়। জল শূন্যতা এবং রেনাল ফেলিওর এই রােগের প্রধান জটিলতা। চিকিৎসা হিসাবে ও আর এস এবং শিরাতে স্যালাইন ব্যবহার করা হয়। রেনাল ফেলিওর হলে ডায়ালাইসিসের প্রয়ােজন হতে পারে।

আমাশয়, জিয়ারডিয়াঃ এন্টামিবা হিস্টলাইটিকা বা জিয়ারডিয়া লাম্বিয়া নামক প্রটোজোয়া এই রােগের কারণ। এটিও জলবাহিত রােগ। চিকিৎসার জন্য মেট্রনিড়াজো, ট্রিনিডাজোল, আরনিডাজোল বা সেকনিডাজোল ব্যবহার করা হয়।

ক্রিমিঃ অধিকাংশ ক্রিমি দূষিত জল বা খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, যেমন গােল ক্রিমি, কুচো ক্রিমি ইত্যাদি। ওষুধ হিসাবে মেবেণ্ডাজাল বা অ্যালবেণ্ডাজল ব্যবহার করা হয়।

টাইফয়েড (এন্টেরিক ফিভার): স্যালমানিলা টাইফি নামক ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণে এই রােগ হয়। বর্ষার দূষিত জল এই রােগের সংক্রমণ ঘটায়। এই রােগে যে সব ওষুধ ব্যবহার করা হয় তা হল –

** কোট্রাইমক্সাজোল।, ** অ্যাম্পিসিলিন।** অ্যামক্সিসিলিন। ** সিপ্রফ্লক্সাসিন। ** অফ্লক্সাসিন। ** লিভােয়ক্সাসিন। **কেফালােস্পােরিন। টাইফয়েড প্রতিরােধের জন্য এখন উন্নত টিকার প্রচলন হয়েছে।

হেপাটাইটিসঃ ভাইরাসের সংক্রমণের জন্য লিভারের প্রদাইকে ভাইরাল হেপাটাইটিস বলা হয়। এ পর্যন্ত আমরা কয়েকটি ভাইরাসের কথা জানি। সেগুলি হল এ, বি, সি, ডি, ই এবং এফ-এর মধ্যে ‘এ’ এবং ই’ জল এবং খাদ্য বাহিত। তাই বর্ষাকালে ‘এ’ এবং ই ভাইরাসের কারণে হেপাটাইটিস হয়।

হেপাটাইটিস সারিয়ে তােলার ভালাে কোনও ওষুধ নেই। তাই রােগ প্রতিরােধের দিকেই নজর দিতে হবে। টিকার ব্যবস্থা আছে কিন্তু ই’ ভাইরাস প্রতিরােধের কোনও টিকা নেই। জল ও খাবারের বিষয়ে সচেতনতা এবং সাবধানতাই এই রােগের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।

বর্ষায় অন্যান্য অসুখঃ

পােলিও মায়েলাইটিসঃ এই অসুখের ভাইরাস দৃষিত জল বা খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। গ্রাম বাংলার মানুষ এখনও মাঠেঘাটে মলত্যাগ করেন। মলের মাধ্যমে পােলিও ভাইরাস শরীরের বাইরে আসে। দূষিত জল বা মাঠের শাক- সবজির মাধ্যমে তা আবার সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রােগ সংক্রানিত করতে পারে। এই অবস্থার প্রতিকারের জন্য পালস পােলিও টিকাকরণের কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে।

ছত্রাকের সংক্রমণঃ বর্ষার সময় ভিজে এবং আর্দ্র পরিবেশে চামড়ায় বিশেষ করে কুচকি ও বগলে নানা রকম ছত্রাক বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণ বাড়ে যার ফলে ছুলি, হাজা ইত্যাদি অসুখে আমরা আক্রান্ত হই। বৃষ্টিতে চামড়ার জুতাে জলে ভিজে গেলে তা শুকোতে সময় লাগে বিশেষ করে রােদ না থাকলে। এর ফলে চামড়ায় সংক্রমণ হয়। তাই বর্ষাকালে চামড়ার জুতাে ব্যবহার না করে এবার বা প্লাস্টিকের জুতাে ব্যবহার করা ভালাে। বন্ধ লেস দেওয়া জুতাের থেকে খােলামেলা স্ট্র্যাপ শুয অনেক উপযােগী।

বর্ষার স্যাতসেঁতে আবহাওয়ায় পুরানাে চামড়ার রােগ বেড়ে যেতে পারে; যেমন সােবাইয়াসিস।

খুসকিঃ ভিজে আবহাওয়ায় চুল এবং মাথার চামড়া ভালােভাবে না শুকানাের জন্য খুসকির উপদ্রব বাড়ে।

ইম্পেটাইগােঃ ছােট ছােট পুঁজ ভরা গােটা সারা দেহে দেখা দেয়। খুব ব্যথা হয়।

বর্ষায় সুস্থ থাকার উপায়ঃ

  • আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে সইয়ে নিতে হবে। গরমের অভ্যাসগুলি আস্তে আস্তে কমিয়ে আনুন। যেমন বারে বারে স্নান করা, দীর্ঘক্ষণ এ.সি. ঘরে থাকা, ফ্রিজের জল খাওয়া ইত্যাদি।
  • বৃষ্টিতে ভিজে গেলে সঙ্গে সঙ্গে শুকনাে তােয়ালে দিয়ে মুছে নেবেন, বিশেষ করে মাথা ও চুল।
  • দূষিত জল ও খাবার থেকে সাবধান হবেন। রাস্তার কাটা ফল বা সরবত খাবেন না। বাড়ির বাইরে স্যালাড কখনও খাবেন না। বিয়ে বাড়িতে খাবার জল হিসাবে মিনারেল ওয়াটার নয় দিলে জল খাবেন না। কোল্ড ড্রিঙ্কস -খেতে পারেন।
  • বর্ষাকালে শাকসবজি রান্নার আগে ভালাে করে ধুয়ে নেবেন। পটাসিয়াম পারমাঙ্গানেটের সলিউশন দিয়ে ধুয়ে নিতে পারলে ভালাে হয়। মাঠে, ক্ষেতে মানুষ এবং জীবজন্তু মলত্যাগ করে একথাটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে।
  • শিশুদের মুখে আঙুল দেবার অভ্যাস থাকে তাই তাদের হাত সব সময় পরিষ্কার রাখবেন।
  • একটু বড় ছেলেমেয়েদের নখের লায় যে ময়লা জমে তার মধ্যে রােগ জীবাণু থাকতে পারে। নিয়মিত তাদের নখ কেটে দেওয়া দরকার।
  • বর্ষায় ত্বক পরিষ্কার রাখতে হবে। জমা জলে পা ডুবে গেলে বাড়ি ফিরে ভালো করে হাত পা ধুয়ে পরিষ্কার শুকনাে তােয়ালে দিয়ে মুছে ফেলুন।
  • মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে মশার জন্মস্থানে (জমা জল) লার্ভা নাশক ব্যবহার করতে হবে। বাড়িতে মশারি ব্যবহার করা প্রয়ােজন। স্প্রে বা ধূপও ব্যবহার করা যায়।
  • বিজ্ঞান সম্মতভাবে পশু পালন, বিশেষ করে শুয়াের পালন করা উচিত।

টিকাঃ যে সব রােগ প্রতিরােধের জন্য টিকার প্রচলন আছে তার ব্যবহার যেমন টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ, পােলিও মায়েলাইটিস এবং জাপানি এনকেফালাইটিস। এই সব টিকা অবশ্যই দেওয়া উচিত।

বর্ষায় নানারকম সমস্যা থাকেই। তাই সব ব্যাপারেই একটু সাবধান হওয়া উচিত। বিশেষ করে জল ও খাবারের ব্যাপারে। তবে একটু নিয়ম মেনে চলতে পারলে বর্ষার রােগ আপন কে স্পর্শ করলেও কাবু করতে পারবে না।

ট্যাগঃ জেনে নিন বর্ষাকালে রােগ ব্যাধি থেকে দূরে থাকার টিপস, বর্ষাকালে রােগ ব্যাধি দূরে রাখবেন যেভাবে, বর্ষাকালে রােগ ব্যাধি মুক্ত থাকার টিপস, বর্ষাকালে রােগ ব্যাধি থেকে নিজেকে যেভাবে সুস্থ্য রাখবেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button