প্রবন্ধ রচনা

বাংলার একটি গ্রামের চিত্র প্রবন্ধ রচনা

একটি গ্রামের চিত্রঃ  তােমার গ্রামটিকে তুমি কেন ভালােবাসাে সম্পর্কে প্রবন্ধ রচনা। এই প্রবন্ধ অনুসারে আমারা অনুরুপ রচনা: বাংলার একটি গ্রামের চিত্র লিখতে পারি। এটিও পড়ুন – প্রতিবন্ধীদের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রবন্ধ রচনা 2020

বাংলার একটি গ্রামের চিত্র প্রবন্ধ রচনা

রচনা-সংকেত : ভূমিকা—প্রকৃতির রূপ-বিস্তার—ঋতুতে ঋতুতে রূপসজ্জা—পূজা-পার্বণ ও সাংস্কৃতিক জীবন-দুঃখ-দারিদ্র্যের দিক-আধি ব্যাধি উপসংহার।

ভূমিকা

ঐ যে গাটি যাচ্ছে দেখা আইরি খেতের আড়ে —
ওই গাঁই আমার জন্মভূমি স্বর্গপুরী। ওর আলােতে আমি প্রথম চোখ মেলেছি। বুক ভরে নিয়েছি ওর তাজা প্রাণদ বাতাস। ওর মাঠের শস্যকণা, বাগিচার ফলমূল দিয়েছে ক্ষুধার অন্ন, দিয়েছে দেহের পুষ্টি।
ও নদ নদী, মাঠ ঘাট, গাছগাছালি, জীবজন্তু, পাখপাখালি ও মানুষজনের সঙ্গে ক্ৰম পরিচিতির নৈকট্যে ঘটেছে আমার হৃদয়ের যােগ, আত্মার আত্মীয়তা। তাই আমার গর্ব: ‘ঐটি আমার গ্রাম, আমার স্বর্গপুরী,/ ঐখানেতে হৃদয় আমার গেছে চুরি।

প্রকৃতির রূপবিস্তার

ছায়াসুশীতল শান্ত পরিবেশে আমার গ্রামটি অবস্থিত। গ্রামের উত্তরপ্রান্ত ছুঁয়ে সােজা প্রবাহিত হয়েছে। স্বচ্ছসলিলা বিদ্যাধরী। নদীর কিনারা ছাড়িয়ে দক্ষিণ মুখে এলেই দিগন্তবিস্তৃত অবারিত মাঠ। মাঠের পুব-পশ্চিম লাগােয়া বাড়িঘরের জটলা। টালি-খড়ের ছাওয়া মাটির ঘর, দু-চারটে পাকা দালানকোঠাও আছে। এ-পাড়ায়, ও-পাড়ায় যাওয়া-আসার যােগসূত্র গাঁয়ের পায়ে-হাঁটা পথ। পথের দুধারে কোথাও বাঁশের ঝাড় কোথাও ঘেটু আশশ্যাওড়ার জঙ্গল, কোথাও হিজল, অর্জুন করঞ্জার শাখা প্রশাখায় গুলঞ্চ লতার বিস্তার, কোথাও ঝুরি নামিয়ে গ্রাম-ইতিহাসের নীরব সাক্ষী প্রাচীন বট। তাল-খেজুর-পাকুড়-অশ্বখ আছে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। গাঁয়ের পুবদিকে আম-কাঁঠালের বাগান ‘রাখালের খেলাগেহ।
পশ্চিমে ঘরামিপাড়াকে ডাইনে রেখে নয়ানজুলির ছােটো বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে কয়েক পা এগােলেই মজে যাওয়া পদ্মদিঘি। তাহলেও দু-চারটে পদ্ম ফোটে এখনও। সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের বর্ণালি শােভা দেয় নয়ন-মন জুড়িয়ে। জ্যোৎস্নার দুধ সাগরে ডুব দিয়ে ওঠা নৈশ প্রকৃতির রূপমাধুর্যের তুলনাই হয় না। পশুপাখির বিচিত্র কলতানে ভরে থাকে গাঁয়ের প্রকৃতি-অঙ্গন। গাড়ি ডাকে হাম্বা রবে। ফুলের কানে কানে গুনগুনিয়ে কথা বলে অলি। কোকিল ডাকে মধুশ্রী পঞ্চমে। ‘ডাকে কুবাে কুব কুব লুকায়ে কোথায়। বউ-কথা-কও ডাক, চাতকের কাতর ধ্বনি, ঘুঘুর ক্লান্ত-স্বর গ্রাম্য প্রকৃতির বিশিষ্ট ধ্বনিসম্পদ।

ঋতুতে ঋতুতে রূপসজ্জা

আমার প্রিয় গ্রামটি ঋতুতে ঋতুতে সাজে নবরুপে। গ্রীষ্মের দাবদাহে খাল-ডােবা-নালা যায় শুকিয়ে। বিদ্যাধরীও তলে নেমে যেন দু পায়ে বালির বাধা ঠেলে এগােয়। শত দীর্ণ মাঠ থাকে শস্যশূন্য। বর্ষার আগমনে দৃশ্যপট যায় একেবারে পালটে, আকাশে তখন সজল কালাে মেঘের মেলা। কখনও মাঝে মাঝে, কখনও দিনভর বৃষ্টি ঝরে অবিরাম। খাল-ডােবা-নালা জলে ভরে থইথই। বিদ্যাধরীতেও নামে যেন ভরা যৌবনের ঢল। গাঁয়ের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। মাঠে চলে চাষের কাজ। ধান-পাট- আখের চারাগুলি সবুজ ও সতেজ হয়ে মাথা জাগিয়ে ওঠে। যেদিকেই চোখ যায় অপূর্ব শ্যামশােভা। ভাদ্রে ‘অরুণ আলোর অঞ্জলি নিয়ে আসে শরৎ। শিশির ভেজা দূর্বায় ঝরে শিউলি। কাশ ফোটে। নির্মেঘ আকাশে রুপাে-হাসি হাসে চাঁদ। হেমন্তে শিশির আর হিমের পরশে মাঠের মঞ্জুরিত শস্যে ধরে সােনা রং। শীতে পাকা ফসল ঘরে তােলার কাজে ব্যস্ত হয় গাঁয়ের মানুষ। রবিশস্য চাষের কাজও চলে একই সঙ্গে। একসময় শীতাতুর ঘুমঘাের প্রকৃতি ‘ফাগুনের আলো সোনার কাঠিতে জেগে ওঠে। পাতা ঝরার পালা চুকে গিয়ে নব কিশলয়ে ভরে ওঠে রিক্ত শাখাপ্রশাখা।

পূজা পার্বণ ও সাংস্কৃতিক জীবন

গ্রামের মানুষ আজও বারাে মাসে তেরাে পার্বণের আনন্দে মাতে। দশহরা, মনসার পূজা, ভাদুলক্ষ্মীর পূজা, কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা, নবান্ন, পৌষ-পার্বণ, তুষ-তুষালি, শিবের গাজন, শীতলা-চণ্ডী-ধর্মঠাকুরের পূজা—এমন কত অনুষ্ঠানই হয় সারাবছর। তা ছাড়া শারদীয়া পূজার মতাে সর্বজনীন উৎসবেও
মাতে গ্রামের মানুষ। গ্রামীণ সাংস্কৃতিক জীবন ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। নামসংকীর্তনের আসর বসে, হরির লুঠ হয়, মহােৎসবে সব শ্রেণির মানুষ পঙক্তিভােজে প্রসাদ গ্রহণ করে, রায়েদের হরিতলায় আজও কথকতার আসর বসে, সুরেশ ওঝার মনসার থানে মনসার ভাসান-গান হয়। কিছু অতি-উৎসাহী যুবক টিকিট বিক্রি করে কলকাতার অপেরা দল এনে পালাগান করায় বুড়ােশিবের স্থানে। গাজন উপলক্ষ্যে মিনি সিনেমা বসে, সারারাত ধরে চলে ভিডিও প্রদর্শনী। বৈষ্ণব এর আখড়ার প্রভাতি সংগীত কিংবা মসজিদের আজান সকালে ঘুম ভাঙায়।

দুঃখ-দারিদ্র্যের দিক

তা বলে কী গাঁয়ের মানুষের দুঃখকষ্ট দারিদ্র্য নেই ? সবই আছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা আর বঞ্চনায় আর পাঁচটা গ্রামের মতো গাঁয়েরও হতশ্রী অবস্থা। অনেক খাল-ডােবাই কচুরিপানায় ভরা, পথঘাটের আশপাশ জঙ্গলাকীর্ণ। দারিদ্র কৃষিজীবী ও খেটে-খাওয়া মানুষের নিত্যসঙ্গী। প্রয়ােজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পথঘাট, যানবাহনের একান্ত অভাব। কৃষিনির্ভর গ্রামটিতে কৃষি ছাড়া অর্থোপার্জনের অন্য কোনাে বিকল্প সংস্থান নেই। দুঃখের কথা, স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরেও গ্রামটি থেকেছে অনুন্নত গ্রামের তালিকায়।

আদিব্যাধি

আধি ব্যাধির প্রকোপ ও কম নয়। জ্বর জ্বালা, আন্ত্রিক, টাইফয়েড প্রভৃতি সংক্রামক ব্যাধির কালগ্রাস থেকে গ্রামের মানুষের পরিত্রাণ মেলে না। অনেকের চিকিৎসা হয়, অনেকে অর্থাভাবে ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়ে ব্যাধির সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে। অনেক ক্ষেত্রেই শােকাবহ পরিণাম আসে।শােকে-বিপদে এপাড়ার-ওপাড়ার মানুষ বুক দিয়ে পড়ে।

উপসংহার

দুঃখদৈন্য, আধি ব্যাধি সত্ত্বেও গ্রাম আমার স্বর্গপুরী। গ্রামের মানুষ আবাদ করে, বিবাদ করে, আবার, সুবাদও করে। তারা সরল, নিরভিমান। তারা বাধা-বাঁধনহারা, তারা স্বাধীন-সুখী। এখানে আছে মায়ের বুকভরা স্নেহ, বাপের সস্নেহ শাসন, প্রিয়জনদের অকৃত্রিম ভালােবাসা। বিপদে এপাড়ার-ওপাড়ার মানুষ আসে বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে। আনন্দ-উৎসবের কল্যাণী-ইচ্ছাও সকলে ভাগ করে নেয় সহর্ষ চিত্তে। সেজন্যই তাে গ্রাম আমার এত প্রিয়-মনটি আমার সেথায় গেছে চুরি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button