Sunday, August 9, 2020
ইংরেজিNewstechnologyভাবসম্প্রসারণস্বাস্থ্য

অধিক মোবাইল ফোন ব্যবহারে ডেকে আনছি মরণ রোগ

তথ্য প্রযুক্তির যুগে মোবাইল ছাড়া আমারা একটি মর্হুতে চলতে ফিরতে পারিনা। মোবাইল ফোন আমাদের একটি অতি প্রয়োজনীয় ডিভাইস তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কম্পিউটারের প্রায় ৮০ ভাগই কাজই এই মোবাইল ফোনে মাধ্যমে করিয়ে নেওয়া করা যায়। যেমন – ধরুন একটা জামা কিনবেন? শপিং মলে নাগিয়ে ঘড়ে বসেই অনলাইনে বুক করুন, বা এই ধরুন রেলের টিকিট কাটবেন? রেল ষ্টেশনে না গিয়েই ঘড়ে বসে মোবাইল দিয়েই কাটুন, কাউকে টাকা পাঠাবেন ঘড়ে বসে মোবাইল দিয়ে টাকা পাঠিয়ে দিন, দরকারিয় email ফোনেই সেরে ফেলা যায়। এরকম হাজারো কাজ আমারা এখন মোবাইল দিয়ে করি। তাহলে ভাবুন একটি মর্হুরতে জন্য হলেও কি আমারা মোবাইল ছাড়া চলতে পারি।

কিন্তু এখন কথা হলো মোটামুটি আমরা অনেকেই জানি মোবাইল ফোন অতিরিক্ত ব্যবহারে আমাদের ক্ষতি হয়। কিন্তু কি ক্ষতি হয় তা কজন জানি? হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র জানি এর ক্ষতিকর প্রভাব গুলো। ঐ হাতে গোনা কয়েকজনও জানা সত্ত্বেও মোবাইল ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে পারেনা।

মোবাইলের রেডিয়েশন কিভাবে কাজ করে?

মৌলিক কিছু কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করার প্রয়োজনে প্রতিটি মোবাইল ফোনকেই কিছু পরিমাণে বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তেজস্ক্রিয়তা তথা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন ( Electromagnetic Radiation ) নির্গত হয়। মোবাইল ফোন রেডিও ওয়েভ বা বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে সিগন্যাল প্রেরণ করে। এই রেডিও ওয়েভ আছে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এনার্জি, যা আসলে এক ধরনের বিদ্যুৎচৌম্বকিয় তেজস্ক্রিয়তা(Electromagnetic Radiation)
রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তার উৎসঃ

সাধারণত আমরা যখন মোবাইল ফোনে কথা বলি তখন ফোনের ট্রান্সমিটারটি আমাদের মুখ থেকে নির্গত শব্দকে গ্রহণ করে সেটিকে ধারাবাহিক সাইন ওয়েভে সংকেতায়িত করে। সাইন ওয়েভ হচ্ছে একধরনের অনির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তরঙ্গ যেটি ফোনের এন্টেনা থেকে নির্গত হয়ে ইথারে প্রবাহিত হয়।

রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তার কিছু কথাঃ

মোবাইল ফোনের মধ্যে যে ট্রান্সমিটার থাকে সেগুলো বেশ কম শক্তির হয়ে থাকে। সেলফোন ০.৭৫ থেকে ১ ওয়াট শক্তিতেই দিব্যি চলতে পারে। ফোনের নির্মাতাভেদে এর ভেতরে ট্রান্সমিটারের অবস্থান বিভিন্ন জায়গায় হতে পারে; তবে সাধারনত এটি ফোনের এন্টেনার খুব কাছাকাছি থাকে।
সংকেতায়িত সিগনালকে প্রেরণ করার দায়িত্ব যে বেতার তরঙ্গের, সে তরঙ্গ গঠিত হয় এন্টেনা থেকে নির্গত বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তেজস্ক্রিয়তা বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন দিয়ে। এন্টেনার কাজ হচ্ছে বেতার তরঙ্গকে শূন্যে ছড়িয়ে দেওয়া। মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে এসব তরঙ্গকে গ্রহণ করা বা রিসিভ করার দায়িত্ব হচ্ছে মোবাইল ফোনের টাওয়ারে স্থাপিত একটি রিসিভারের।
মোবাইল রেডিয়েশনের সম্ভাব্য রোগসমূহঃ

মোবাইল রেডিয়েশনের মাধ্যমে সম্ভাব্য যে রোগ সমূহ হতে পারে তা হলো- ১) ক্যান্সার (Cancer), ২) ব্রেইন টিউমার (Brain tumors), ৩) আলঝেইমার’স (Alzheimer’s), ৪) পারকিনসন’স (Parkinson’s), ৫) ক্লান্তি (Fatigue), ৬) মাথা ব্যথা (Headaches) এছাড়াও অনেক রোগ হতে পারে, তার মধ্যে ক্যান্সার ও ব্রেইন টিউমারই প্রধান।
মোবাইল ফোন ব্যবহারে ক্ষতি সমূহঃ

বিজ্ঞানীদের মতে, একটি পরমানবিক চুল্লির যে বিপদ তার থেকে মোটেও কম নয় এই ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড এর ক্ষতি । যাদের করোটি যত পাতলা , তাদের মোবাইল এফেক্ট তত বেশি । ব্রেন টিউমার থেকে শুরু করে নার্ভাস সিস্টেম ব্রেকডাউন , হার্ট অ্যাটাক সব কিছুরই সম্ভবনা বেড়ে চলেছে ।
মোবাইল ফোন ব্যবহার এর ফলে আমাদের মস্তিস্কের একটা অংশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। তার ফলে মস্তিষ্কের টিস্যু গুলি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মগজেও থাকে তার প্রতিক্রিয়া ।
ঝড়ের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে সমূহ বিপদ দেখা যেতে পারে ।
বুক পকেটে মোবাইল রাখলে হার্টের সমস্যা হবার সম্ভবনা বেশি থাকে ।
ইয়ার ফোন ব্যবহার না করে, কানের গোড়ায় রেখে মোবাইল এ বেশি কথা বললে কানে কম শোনা এমনকি বধিরতার আশঙ্কা পর্যন্ত থাকতে পারে ।
বন্ধ্যাত্ব বাড়ছে । অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার করলে মুখে ক্যানসার বা মেলিগনানট টিউমার এর ঝুঁকি বাড়ে ।
শিশুদের মস্তিস্কের কোষ নরম বলে তাদের মারত্মক ক্ষতি হচ্ছে । বিজ্ঞানী হাইল্যান্ড দেখিয়েছেন, তড়িৎ চুম্বকীয় দূষণের কারনেই শিশুরা এপিলেপসি ও অ্যাজমায় ভুগছে ।
লেফ সেলফড তথ্য-প্রমানের ভিত্তিতে সুদৃঢ় হয়ে যথেষ্ট জোরের সঙ্গে বলেছেন, সেলফোন এর প্রতিটা কল আমাদের মস্তিস্কের ক্ষতি করে । এমন কি প্যাসিভ স্মকারদের মত যে লোকটা মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে না কিন্তু মোবাইল ব্যবহারকারির কাছে রয়েছে সেও ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে । ফ্রান্সে সান্তিনি আর সুইডেন এ সানডস্তরম আর মাইলড এর সমীক্ষার ফলাফল লেফ সেলফড এর বক্তব্য কে আরও সুদৃঢ় করে তোলে । এঁদের সমীক্ষা অনুযায়ী, সেলফোন ব্যবহারকারি, ২৫% পর্যন্ত বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছেন ।যেমন, মাথাঘোরা , ক্লান্তি , স্মৃতি শক্তি হ্রাস , মাথা ঝিম ঝিম করা, ক্লান্তি প্রভৃতি ।

তাহলে এখন কি ভাবছেন ? আপনার দামী মোবাইলটাকে কি জলে ছুঁড়ে ফেলে দিবেন? নাকি কিছু নিয়ম মেনে পুনরায় দিব্যি মোবাইল ব্যবহার করবেন ?

আসল কথা হচ্ছে পুরোপুরি আমরা তো একেবারেই মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করতে পারিনা, তবে আমরা যদি কিছু নিয়ম মেনে মোবাইল ফোন ব্যবহার করি তাহলে আমরা অনেক রোগের হাত থেকে রক্ষা পাবো ।

মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়মাবলীঃ

স্পিকার অন করে কথা বলুনঃ

মোবাইল ফোন এর স্পিকার অন (speaker on) করে কথা বলার চেষ্টা করুন যাতে আপনার মাথা মোবাইল থেকে দূরে থাকে। যদিও এটাও ক্ষতিকর কিন্তু ঠিক ততটা নয় মাথার সামনে মোবাইল ধরলে যতটা ক্ষতি হবার সম্ভবনা থাকে তার থেকে অনেক কম।

হেডফোন ব্যবহার করুনঃ

যতটা সম্ভব হলে earbuds ইউজ করুন । এগুলো মুলত আপনার মাথাকে মোবাইল থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করবে ।

শরীর থেকে দূরে রাখুনঃ

মোবাইলটাকে সারাদিন অন করে রেখে আপনার দেহের সাথে সংযুক্ত থাকতে দেবেন না। অথবা যদিও রাখেন তাহলে দেখবেন যেন মোবাইল এর অ্যান্টেনা কোনোভাবেই আপনার দিকে না থাকে (সাধারনত মোবাইল এর পেছনে থাকে) ।

ভ্রমণ কালে কম কথা বলুনঃ

গাড়ি, ট্রেন, অথবা প্লেন এ মোবাইল এর ব্যবহার যতটা সম্ভব কম রাখুন । মোবাইল ফোন লোহা নির্মিত জায়গায় বেশি পাওয়ার ইউজ করে আর অনেক বেশি radiation ও ছড়ায় । এছারা গাড়ি বা ট্রেন এ মোবাইল ব্যবহার করলে অ্যাকসিডেনট হবারও ভয় থাকে।

বাড়িতে ল্যান্ডলাইন ব্যবহার করুনঃ

যখন আপনি ঘরে থাকবেন তখন মোবাইল এর পরিবর্তে ল্যান্ডলাইন ব্যবহারের চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন কর্ডলেস ল্যান্ড ফোন গুলি কিন্তু মোবাইল থেকে কম radiation ছড়ায় না। তাই কর্ড যুক্ত ল্যান্ড ফোন ব্যবহার করুন।

মোবাইলে কাভার ব্যবহার করুনঃ

আপনার মোবাইল এর জন্য একটা কাভার কিনুন যেটা ফোনের radiation ছড়ানোকে কিছুটা হলেও রোধ করবে। এছাড়া কভার মোবাইলকে ভেঙ্গে যাওয়া থেকে কিছুটা রক্ষা করে এবং কিছুটা সৌন্দর্য বারায়।

ভালো কম্পানির ফোন ব্যবহার করুনঃ

এমন একটা ফোন ব্যবহার করুন যেটা কম radiation ছড়ায়। বর্তমানে মোবাইল ফোন কোম্পানি গুলো স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন হয়েছে, এবং তারা এমন ধরনের মোবাইল তৈরির চেষ্টা করছে যেগুলো কম radiation ছড়ায় ।

ভিটামিন যুক্ত খাবার খানঃ

ভিটামিন C আর E সমৃদ্ধ খাবার খান যেগুলো আপনার দেহের কোষগুলোকে ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করবে । লঙ্কা , পেয়ারা, পেঁপে, কমলা লেবু, Strawberries প্রভৃতি খান এতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন C আছে আর লাল লঙ্কা পাওডার, পাইন বাদাম, রান্না করা শাক প্রভৃতি খান এতে ভিটামিন E আছে।

রাত্রে সম্ভব ফোন বন্ধ কিংবা দূরে রাখুনঃ

রাতে শোবার সময় বালিশের নিচে অথবা বিছানায় মোবাইল নিয়ে শোবেন না কারন রাত্রে মোবাইল আপনার দেহের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে সংযুক্ত থাকে বলে আপনার দেহে এর প্রভাব অনেক বেশী পরতে পারে ।

মোবাইলের সিগন্যাল লক্ষ্য করুনঃ

মোবাইলে যখন কম সিগন্যাল বা টাওয়ার থাকে তখন মোবাইল আরও বেশী radiation ছড়ায় তাই আগে সিগন্যাল পুরো আসতে দিন তারপর না হয় আপনার বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলবেন।

কথা কম বলে ম্যাসেজে করুনঃ

মোবাইলে কথা বলার থেকে ম্যাসেজে কথা বলুন , এতে অন্তত মোবাইলটা আপনার মাথার কাছ থেকে দূরে থাকবে ফলে ক্ষতি হবার সম্ভবনা কিছুটা হলেও কমবে।

এছাড়াও – মোবাইলে এক টানা দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলা উচিত নয়। যত টুকু সম্ভব বাহিরে বসে ফোনে কথা বলা ভালো। মোবাইল যতটা সম্ভব শিশুদের থেকে দূরে রাখা ভালো। এক্সটারনাল এন্টেনা ছাড়া গাড়িতে মোবাইল ব্যবহার করা উচিত নয়। মোবাইলে কথা বলার সময় বাম কান ব্যবহার করা কিছুটা ফলদায়ক, কখনও চার্জার লাগানো অবস্তায় কথা বলা উচিৎ নয়, সম্ভব হলে হেডফোন ব্যবহার করা উচিৎ।

হ্যান্ডসেটের বিকিরণের মাত্রা মাপার আন্তর্জাতিক পরিমাপককে বলা হয় ‘স্পেসিফিক অ্যাবসর্পশন রেট বা এসএআর (SAR)। আপনার মোবাইলে SAR মাত্রা *#07# ডায়েল করে পরীক্ষা করে নিতে পারেন। যদি 1.6 ওয়াট প্রতি কিলোগ্রাম [ 1.6 watts per kilogram (1.6 W/kg) ] এর মত্রা নিচে থাকে তাহলে ভাববেন কিছুটা নিরাপদে আছেন। কিছু জনপ্রিয় স্মার্ট ফোনের SAR রেট দেওয়া হলো-

  • iPhone 6:>>  1.59 W/kg
  • LG G3:>> 0.99 W/kg
  • LG G2:>> 1.44 W/kg
  • Samsung Galaxy Note 2:>> 0.42 W/kg
  • Samsung Galaxy Note 3:>> 1.07 W/kg
  • Samsung Galaxy Note 4:>> 1.20 W/kg
  • Samsung Galaxy S5:>> 1.28 W/kg
  • HTC One (M8):>> 1.29 W/kg

মোবাইল ফোনের ব্যবহারের ক্ষতির কথা অনেক দিন থেকে শুনে আসছি। তবে মাঝে মধ্যে অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন মোবাইল ব্যবহারে কোন ক্ষতি নেই।

Leave a Response