Sunday, August 9, 2020
প্রবন্ধ রচনাজীবনীবাংলা ব্যাকরণ

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে প্রবন্ধ রচনা

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে প্রবন্ধ রচনা

ভূমিকা

রবীন্দ্রনাথের সর্ব ব্যাপী প্রতিভা দেশকালের সীমা লঙ্ঘন করে চিরকালের মর্যাদা পেয়েছে। আজ যদি তাকে কবি সার্বভৌম বলে ভূষিত করা যায়, তবে বধ করি, একালের কবিদেরও আর আপত্তির কারণ থাকবে না। কাব্য ও সাহিত্যের সমস্ত বিভাগের এমন অনায়াস সৃষ্টি ক্ষমতা সাহিত্যের ইতিহাসে দুর্লভ। বুদ্ধদের বসুর মতো রবীন্দ্রসমাচোলক কবি পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ভাবে ও ভাষায় রবীন্দ্রনাথ এখনো আধুনিক বাঙালি কবিদের গুরুস্থানীয়। তাঁর কবিগুরু অভিধাটি শুধু একটি অলংকার নয়- সার্থক শিরোভূষণ।

জনপ্রিয়তার কারনঃ

তাঁর এই সর্বতো মুখী প্রভাবের তাৎপর্য বিশেষভাবে উপলব্ধ হয়েছে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর আবির্ভাবের ১২৫ বছর পুর্তি উপলক্ষে দেশ- বিদেশে তাকে নিয়ে উৎসাহ – উদ্দীপনার মধ্যে থেকে। বাংলায় তোঁ তাঁর সাহিত্য ও কর্মাদর্শ প্রচারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিদেশেও তাঁর সাহিত্যের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে নতুন করে। সোভিয়েত রশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশে তাঁর সাহিত্যের অনুবাদ নতুন করে শুরু হয়েছে। স্বর্বভাবতই তাঁরই বিশ্বমৈত্রী এবং আন্তর্জাতিকতার আদর্শ পৃথিবীর মানুষ এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে। এ যুগে এই সমস্ত আদর্শের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কারণ সারা পৃথিবীতে শক্তির লড়াই চলছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় সবাই দিন গুনছে।

রবিন্দ্রসাহিত্যের ঐশ্বর্য অজস্র বৈচিত্রে পরিপুর্ন। কাব্য তোঁ বটেই, উপন্যাস, নাটক, ছোটো গল্প, চিন্তা মূলক গদ্য প্রবন্ধ এবং মৌলিক সাহিত্য- সমালোচনা- সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবাধ সঞ্চরণ। কিন্তু সমস্ত বৈচিত্রের মধ্যেও তাঁর ব্যক্তিত্ব একটি স্থির বিশ্বাসে দীপ্ত- সেটি হল মানুষের মহত্ব ও পৃথিবীর প্রাণশক্তির উপর প্রত্যয়। আর সেই প্রত্যয় সবচেয়ে বেশি প্রকাশলাভ করেছে তাঁর কাব্যে।

কাব্যের বৈশিষ্ট্যঃ

রবীন্দ্রকাব্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিশিষ্ট এর গতিশিলতা ও বিবর্তন। কবিপ্রতিভার উন্মেষ পর্বে গৃহবন্দী কবি মুক্তির আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছিলেন। ‘সন্ধ্যা সঙ্গিত’, ‘প্রভাত সঙ্গিত’, প্রতিভার যুগ পেরিয়ে ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, পর্বে তাঁর কবি মানস প্রকৃতি ও মানবসংসারে সঙ্গে নব নব পরিচয়ে বিকশিত। গিতাঞ্জলির ঈশ্বরনিষ্ঠ মানবচেতনা ‘ বলাকায় এসে গতির চাঞ্চল্য দূরপথের অভিযাত্রী। ঈশ্বর, মানুষ ও প্রকৃতির সমনয়ে তাঁর যে কবি প্রত্যয় ক্রমবিকশিত হল, জীবনের শেষ পর্বে তা কর্মমুখর মানবসংসারের প্রতি সুতীব্র আকর্ষণের রুপ নিল। রবীন্দ্রনাথের শেষ পর্বের কবিতায় যে মানবপ্রীতি দেখি, তা আমাদের বিস্ময়ে অভিভূত করে। ‘গীতাঞ্জলীর’ মানুষের সঙ্গে এযুগের কর্মী মানুষের লক্ষণীয় পার্থক্য। এখানে আপন শক্তিতে বলিষ্ঠ মানুষ যুগে যুগে সভ্যতার রুপ বদলায়, ইতিহাসের স্রষ্টা এরাই। ‘ঐকতান’, ‘ওরা কাজ করে’, ইত্যাদি কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের স্বীকৃতি ঘটেছে ইতিহাসের গতিধারার প্রেক্ষাপটে। রবীন্দ্রনাথের মানবপ্রেমিক কবিসত্তার বিবর্তন জীবনের শেষ পর্যায় অবধি বজায় ছিল। সঙ্গে সঙ্গে কবিতার ছন্দ ও ভাষায় অনবরত পরিক্ষা ও পরিবর্তন। রবীন্দ্রকাব্য ‘পরিশেষ’ বলে কিছু নেই, বার বার দেখা গেছে ‘পুনশ্চের আগমন’।

কবি ও কর্মীঃ

রবীন্দ্রপ্রতিভার মহত্ব ও এদিকে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কর্মধারার মধ্যে। তিনি শুধু ভাবুক ছিলেন না।, ছিলেন অক্লান্ত কর্মী। দেশের ও বিদেশের যে কোন সমস্যায় তিনি ভাবিত। এদেশের অর্থনীতি ও শিক্ষানীতির তিনি ছিলেন নতুন পথপ্রদর্শক। কিন্তু ভাবুক কবির কথায় সেদিন কেউ গুরুত্ব দেয়নি। তিনি নিজে শান্তিনিকেতনে ও শ্রীনিকেতনে নিজের চিন্তাকে কাজে রুপায়িত করার অনলস উদ্যম দেখিয়ে গেছেন।

উপসংহারঃ

কোন দেশেই রবীন্দ্রনাথের মত ব্যক্তিত্ব সুলভ নয়। হাজার বছরের ব্যবধানেও এমন সর্বস্পর্শী মহৎ মানুষের সাক্ষাৎ ঘটেনা। ইদানীং তাই রবীন্দ্র- বিরোধিদের মধ্যেও যে রবীন্দ্রানুরাগ দেখা যাচ্ছে, তাতে আশা হয় দেশবাসী তাঁর কাব্য ও কর্মের মুল্য বুঝতে শুরু করেছে। কবি বলতেন, কবিকে তাঁর জীবনচরিতে পাওয়া যাবে না। ‘জীবনস্মৃতি’, ‘ছেলেবেলা’, ‘আত্মপরিচয়’ প্রভৃতি আত্মচরিতে কবির উপলব্ধি কিভাবে বিভিন্ন ঘাত সঙ্ঘাতের মধ্য দিয়ে পরিনতির পথে এগিয়েছে, তাঁরই সাক্ষাৎ পাই। তাই তাঁর কাব্যের নিবিষ্ট পাঠ এবং কর্মের নিবিড় অনুশীলনই তাকে জানার প্রকৃষ্ট পন্থা। তাঁর কাব্য তথা সমগ্র সাহিত্য পাঠই তাঁর জীবনচরিত পাঠের সমপর্যায়ভুক্ত।

Leave a Response