প্রবন্ধ রচনাউৎসবOthersঅন্যান্যবিনোদন

বইমেলা প্রবন্ধ রচনা 700 শব্দের মধ্যে

বইমেলা রচনা - Book Fair Essay in Bengali

বইমেলাঃ এই পোষ্টে বই মেলা প্রবন্ধ রচনা শেয়ার করা হল। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান প্রধান উৎসব এবং কোথায় পালন হয় এর আগের পোষ্টে আলোচনা করা হয়েছে, চাইলে দেখে নিতে পারেন এই প্রবন্ধ রচনার সঙ্গে অনেক তথ্য পাবেন। এই প্রবন্ধ অনুসারে অনুরূপ প্রবন্ধ লেখা যাবে – পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত গ্রন্থমেল্‌ বই মেলার প্রয়ােজনীয়তা, পাঠক সমাজ ও বইমেলা, মেলা ও বইমেলা, ভারতে বই মেলা, বাংলাদেশে বই মেলা, গ্রন্থমেলার ইত্যাদি।

বইমেলা

[ প্রসঙ্গসূত্রঃ ভূমিকা ; মেলা ও বইমেলা ; বইমেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস; ভারতে এবং বাংলায় বইমেলা ; বইমেলার বৈশিষ্ট্য ; উপসংহার।]

“যেখানে তার অমৃত, যেখানে মানুষকে নয়—–আত্নাকে প্রকাশ করে,
সেখানে সকলকে সে ডেকে আনে, সেখানে ভাগের দ্বারা ভােজের
ক্ষয় হয় না; সুতরাং সেইখানেই শান্তি। ববীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভূমিকা

আমাদের দেশে মেলা বলতে এককালে বুঝতাম ধর্মীয় কোন উৎসব উপলক্ষে বহু লােকের মিলন। কুম্ভমেলা, গঙ্গাসাগর মেলায় লক্ষ লক্ষ লােক সমবেত হ’ত সারাদেশ থেকে এসে। এর পেছনে আধ্যাত্মিক কারণ থাকলেও দুর্গম পথে অভষ্টিলাভের দুর্মর বাসনাও ছিল প্রবল। পশ্চিমবঙ্গে কবি জয়দেব, চণ্ডীদাস প্রভৃতির জন্মস্থানে, শান্তিনিকেতনের প্রাঙ্গণে প্রতি বছর এই রকম মেলা দেখা যায়। এইসব মেলায় কত বিচিত্র লােকের আগমন ঘটে, জাত-ধর্মের প্রশ্ন গৌণ হয়ে যায়। মনের মানুষের খাজ করতে করতে বাউল বেরিয়ে পড়ে পথে, দু’দিনের জন্য এসে বিশ্রাম নেয় বীরভূম-শান্তিনিকেতনের মেলাপ্রাঙ্গণে। একতারা হাতে নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ে নিরুদ্দেশের পথে। মেলা এই ঘরছাড়া মানুষকে দু’দিনের জন্য আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধেছিল। মানুষে মানুষে এই আত্মীয়তার বন্ধনটি আমাদের দেশের তীর্থে তীর্থে মিলন-মেলায় সুচিরকাল থেকে রচিত হয়ে আসছে।

মেলা ও বই মেলা

এইসব উৎসব ও মেলার জগতে এখন নতুন প্রবেশাধিকার পেয়েছে বই মেলা। জ্ঞানের সন্ধানে অভিযাত্রী মানুষ তাে কত পথ হেঁটেছে। ঈশ্বর খুঁজতে খুঁজতে কত জনে প্রাণ দিয়েছে। তবু চলা বন্ধ হয় নি এবং চলতে চলতে বিশ্রাম নেওয়ার একটা সুযােগ সম্ভব হয় এইসব মেলায়। বই মেলায় বিদ্যাসন্ধানী মানুষের চিত্তবপ্তির ব্যাপক আয়ােজন লক্ষণীয়। বইয়ের মেলা তাে নয়, বইপ্রেমী পাঠকের মেলা। বই মেলা বলতে পুস্তক প্রদর্শনীর সূত্রে গ্রন্থপ্রিয় মানুষকে মিলিত করার উদ্দেশ্যটি বুঝতে হবে। অবশ্য এর সঙ্গে আজকাল পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত হয়েছে। কিন্তু তাতে মেলার উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। লেখক, পাঠক, প্রকাশক, মুদ্রক ইত্যাদি আধুনিক গ্রন্থজগতের সকল কুশীলবের মিলনক্ষেত্র এই গ্রন্থমেলা।

এটিও পড়ুন – কান্তজীউ মন্দির এর জানা অজানা

বই মেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

গ্রন্থমেলার ঐতিহ্য অবশ্য খুবই প্রাচীন। যতদূর জানা যায়, শুরু ত্রয়ােদশ শতকে। পঞ্চদশ শতকের শেষার্ধে ইংলণ্ডে এবং সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে জার্মানীর ফ্রাঙ্কফুটে, উনিশ শতকের শুরুতে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে পুস্তক মেলার আয়ােজন হয়েছিল। শুরুতে অন্যান্য বিচারযােগ্য পণ্যের একটি অংশ হিসাবে পুস্তক প্রদর্শিত হলেও ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র পুস্তক প্রদর্শনী ও মেলা গড়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে দেশ-বিদেশে অনুষ্ঠিত বহু বইমেলার মধ্যে উল্লেখ্য ফ্রাঙ্কফুর্ট বই মেলা (১৯৪৯ খ্রীঃ)। কিছুকাল আগেও এখানে একটি মেলা হয়েছে, তাতে বহু ভারতীয় প্রকাশক যােগ দিয়েছেন।

ভারতে এবং বাংলায় বই মেলা

ন্যাশন্যাল বুক ট্রাস্ট ১৯৬৯ খ্রীস্টাব্দে বােস্গাই শহরে যে বইমেলার ব্যবস্থা করে তাই সম্ভবত ‘ভারতে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় গ্রন্থমেলা ধীরে ধীরে দিল্লী, মাদ্রাজ, কলকাতা প্রভৃতি নড় বড় শহরে বইমেলা প্রসার লাভ করে এবং বই মেলা একটি জাতীয় উৎসবের রূপ নেয়। পশ্চিমবঙ্গে কলকাতা ময়দানে এখন প্রতি বছর শীতকালে কিছুদিনের ব্যবধানে দুটি পুস্তকমেলা হয়ে থাকে। একটি পশ্চিমবঙ্গ এন্থমেলাউদ্যোক্তা বঙ্গীয় প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতা সমিতি। অন্যটি কলকাতা বই মেলা’—উদ্যোক্তা-~-পাণলিশার্স অ্যাও বুক সেলার্স গিল্ড। কলকাতা বইমেলা ১৯৭৬ খ্রীস্টাব্দে শুরু হওয়ার পর প্রতি বছর সমান উৎসাহ ও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ পাঠক বই কিনছেন, কেউ শুধু দেখছেন, কেউ শুধু মেলার স্টলে ঘুরে ঘুরে আনন্দ পাচ্ছেন। লক্ষ লক্ষ টাকার বই বিক্রীত হয়ে প্রকাশকদের উৎসাহ বর্ধন করছে। তার সঙ্গে আবার বিভিন্ন দেশের পুস্তকের সার মিলিত হয়ে কলকাতা বইমেলাকে আন্তর্জাতিক চেহারা দিয়েছে।

বাংলাদেশে বই মেলা

১৯৪৭ সালে মুক্তধারা ও পুঁথিঘর প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনে তার প্রকাশিত বই মাটিতে চট বিছিয়ে বিক্রি করেন। তিনি সেগুলোতে বিশেষ ছাড়ও দেন। ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমির কাছে বই বিক্রির অনুমতি চান। ১৯৭৮ সালে বই মেলা পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থমেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৫ সালে এই বইমেলার নাম দেওয়া হয় ‘একুশে বইমেলা’। ১৯৯৫ সাল থেকে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগে বইমেলার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বইমেলাকে সফল করতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ভূমিকাও অপরিসীম। এটি উদ্যোক্তা হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের বই মেলা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

বই কেনার আগ্রহ বৃদ্ধি:

ভিনসেন্ট স্টারেট বলেছেন- ”When we buy a book we buy pleasure” অনন্ত বিশ্বে জ্ঞান ও ভাবের অপূর্ব সমন্বয় হলো বই মেলা। মেলায় প্রকাশকরা বিভিন্ন স্টল খোলেন এবং নিজেদের পছন্দের বই সাজিয়ে রাখেন থরে থরে। ফলে সেখান থেকে ক্রেতা অতি সহজেই কাঙক্ষিত বইটি কিনে নিতে পারে। বইমেলায় মূল্য ছাড় দেওয়া হয় যা বই ক্রয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অনেক ক্রেতাই বেশি করে বই কেনে। মেলায় লেখক ও প্রকাশকের উপস্থিতি ক্রেতাদের বই কেনার উৎসাহ বাড়িয়ে তোলে। পছন্দের লেখককে হাতের কাছে পেয়ে পাঠক আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। এ সময় অটোগ্রাফ নিতেও কেউ ভুল করে না।

বই মেলার বৈশিষ্ট্য

বই মেলা অবশ্য অন্যান্য ধর্মীয় বা গ্রামীণ মেলার মত শুধু আনন্দ, গান, গােলমাল, খাবার, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদির সমাহারে বিচিত্র চিত্তবিনােদনের ব্যবস্থা নয়। এ শুধু বইয়ের মেলা, মনের প্রকর্ষ ও চিত্তের গভীরতাবর্ধক একটি বিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। এই উদ্যোগের মধ্যমণি হল জ্ঞানের নীরব অনিঃশেষ ভাণ্ডার-গ্রন্থ। নতুন বইয়ের গন্ধের সঙ্গে যেন পাঠক নবার্জিত জ্ঞানের আশ্বাস পেয়ে উজ্জীবিত হয়।

উপসংহার

কলকাতায় এখন দুটি বড় বই মেলা প্রতি বছর হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও প্রকাশকদের উৎসাহে বাংলাদেশের জেলাশহরগুলিতে এবং দু-একটি ছােট্ট মফস্বল শহরে বইমেলাকে উপসংহার প্রসারিত করে দেওয়া হচ্ছে। এই সব মেলায় পাঠকদের আগ্রহ ও উৎসাহ প্রমাণ করেছে যে, বই শুধু কলকাতা বা বড় শহরবাসীদের প্রিয় বিষয় নয়, গ্রামাঞ্চলের লােকেরাও বই ভালবাসে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button