জীবনীপ্রবন্ধ রচনা

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ প্রবন্ধ রচনা

বিজ্ঞান সাধক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ: প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশ ওবিই, এফএনএ, এফএএসসি, এফআরএস (২৯ জুন ১৮৯৩- ২৮ জুন ১৯৭২) একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী এবং পরিসংখ্যানবিদ ছিলেন। তাকে ভারতে আধুনিক পরিসংখ্যানের জনক বিবেচনা করা হয়। এই পোষ্টে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ প্রবন্ধ রচনা শেয়ার করা হয়েছে। এই প্রবন্ধ অনুসারে অনুরূপ প্রবন্ধ লেখা যাবে রাশিবিজ্ঞানী প্রশান্তচন্দ্র, প্রশান্তচন্দ্রঃ একটি বহুধা ব্যক্তিত্ব, বিজ্ঞান সাধক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, একটি পুরােধা ব্যক্তিত্ব, প্রিয় বিজ্ঞানী, প্রিয় মনীষী, প্রিয় ব্যাক্তি, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ জীবনী ইত্যাদি।

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ

[ প্রসঙ্গসূত্র: ভূমিকা; বংশ-পরিচয়; ছাত্রজীবন ; কর্মজীবন ; গবেষণা ; রাশিবিজ্ঞানে আকর্ষণ ও পড়াশােনা; নৃবিজ্ঞান ও রাশি বিজ্ঞানের সমন্বয় ; রাশিবিজ্ঞান প্রসারে ভূমিকা ; অন্যবিধ কৃতিত্ব ; দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং প্রশান্তচন্দ্র ; সাহিত্যে অনুরাগ ও রবীন্দ্রনাথ; উপসংহার।]

ভুমিকাঃ

বিগত শতকে বঙ্গমাতা ছিলেন সত্যই রত্নপ্রসবিনী। সাহিত্য-বিজ্ঞান-দর্শনে তিনি যে সমস্ত ভূমিকা কীর্তিধর পুরুষের জন্ম দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। তিনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাশিবিজ্ঞানের (Statistics) অন্যতম পুরােধা ব্যক্তিত্ব।

বংশ-পরিচয়

প্রশান্তচন্দ্রের জন্ম ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দের ২৯শে জুন। আদি বাড়ি ঢাকায় হলেও জন্মস্থান কলকাতা। তার পিতার নাম প্রবােধচন্দ্র মহলানবিশ। মাতা নীরদবাসিনী দেবী। পিতা কলকাতার অন্যতম লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রশান্তচন্দ্রের মামা ছিলেন ভারতবিখ্যাত চিকিৎসক ডাক্তার নীলরতন সরকার।

ছাত্রজীবন

প্রশান্তচন্দ্র ছাত্রজীবন থেকেই মেধাবী। ১৯০৮ খ্রীস্টাব্দে ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুল থেকে বিদ্যালয়ের পাঠ সমাপ্তির পর তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯১২ খ্রীস্টাব্দে ছাত্রজীবন পদার্থবিদ্যায় অনার্সসহ বি. এস-সি. পাস করেন। পরের বছরই তিনি ইংল্যাণ্ড যান। সেখানে লণ্ডনের কিংস কলেজে ভর্তি হন। পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দে পদার্থবিদ্যা ও গণিতে প্রথম শ্রেণীর অনার্সসহ ট্রাইপ্স পদক লাভ করেন।

কর্মজীবন

কলকাতায় ফিরে প্রশান্তচন্দ্র ইণ্ডিয়ান এডুকেশনাল সার্ভিসে যােগদান করেন। প্রেসিডেন্সী কলেজের অধ্যাপকরূপেই তার কর্মজীবন শুরু হয়। উক্ত কলেজের সঙ্গে তিনি ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় একটানা তেত্রিশ বছর নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। যেমন ১৯৪৪ পর্যন্ত অধ্যাপকরূপে (১৯২১ খ্রীঃ থেকে বিভাগীয় প্রধানরূপে) ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত অধ্যক্ষরূপে এমন কি অবসর গ্রহণের পরেও তিনি প্রেসিডেন্সীর ‘এমিরিটাস প্রােফেসর’ ছিলেন।

পদার্থবিদ্যার অধ্যাপকরূপে প্রশান্তচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হলেও অচিরেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার পরিচয় ও খ্যাতি বিস্তৃত হতে শুরু করে। ১৯২৩ খ্রীস্টাব্দে তিনি আলিপুরের আবহমন্দিরের ডিরেক্টর পদে বৃত হন। এছাড়া ১৯২১ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্ পর্যন্ত প্রশান্তচন্দ্র বিশ্বভারতীর সাম্মানিক সম্পাদক ( Honarary Secretary ) ছিলেন।

এটিও পড়ুন –বিজ্ঞান ও কুসংস্কার প্রবন্ধ রচনা, Latest 2020

গবেষণা

অবশ্য প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ভারতে রাশিবিজ্ঞানের ( Statistics ) প্রবর্তনা। বর্তমান যুগের কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প, অর্থনীতি ইত্যাদি যে পরিসংখ্যান বিজ্ঞান ব্যতীত অচল, তা তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেন। এদিকে লক্ষ্য রেখে এবং ভারতীয় ছাত্রদের পরিসংখ্যান-গবেষণার সুযােগ-সুবিধার কথা ভেবে প্রশান্তচন্দ্র ভারতীয় রাশিবিজ্ঞান মন্দির ( Indian Statistical institute ) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩২ খ্রীস্টাব্দের ২৮শে এপ্রিল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই গবেষণাগারটি সরকারীভাবে স্থাপিত হয়। বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দিকেও পরিসংখ্যান বিজ্ঞান ভারতে অপরিচিত ছিল। ভারতের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বা প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে গবেষণা, এমন কি পড়াশােনারও ব্যবস্থা ছিল না। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলতে দ্বিধা নেই I.S.I. প্রতিষ্ঠা প্রশান্তচন্দ্রের এক অনন্য কীর্তি।

রাশিবিজ্ঞানে আকর্ষণ ও পড়াশোনা

আধুনিক পরিসংখ্যান বিজ্ঞানের জনক, ভারতে রাশিবিজ্ঞানের প্রবর্তক ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। তার বিশ্বখ্যাতিও এইজন্য। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই পরিসংখ্যান বিজ্ঞানী কেমব্রিজে শিক্ষাকালীন সময়েই কিন্তু রাশিবিজ্ঞানের দিকে আকৃষ্ট হন। প্রকৃতপক্ষে কেমব্রিজে পাঠসমাপ্তির সময়ই তার অন্যতম শিক্ষক ডবলিউ, এইচ. মেকলে তাকে বায়ােমেট্রিকার একটি খণ্ড ও তৎসংক্রান্ত এবং টেবিল পড়তে দেন। এই দুটি পুস্তক পড়েই প্রশান্তচন্দ্র রাশিবিজ্ঞানের দিকে ঝােকেন। দেশে ফিরে অধ্যাপনার ফাকে ফাকে ব্যস্ত হয়ে পড়েন পরিসংখ্যান-বিষয়ক পড়াশােনা ও গবেষণায় ! কার্ল পিয়ারসনের রচনা ও গবেষণাও এ ব্যাপারে তাকে প্রেরণা দান করে। গভীর পর্যবেক্ষণের সাহায্যে কোন বিষয় সম্বন্ধে সংখ্যামূলক তথ্য সংগ্রহ করে, তা থেকে তুলনা, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা প্রভৃতির সাহায্যে কোন তত্ত্বে উপস্থিত হওয়ার বিজ্ঞানসম্মত শাস্ত্রের নাম রাশিবিজ্ঞান। স্বভাবতই এই শাস্ত্র প্রয়ােগনির্ভর। প্রশান্তচন্দ্র তাঁর পড়াশােনা প্রয়ােগের সুযােগ পান ১৯১৭ খ্রীস্টাব্দে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুপণ্ডিত ব্রজেন্দ্রনাথ শীল তখন তৎকালীন পরীক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধে সমীক্ষা করছিলেন। এই কাজে তিনি প্রশান্তচন্দ্রকে আহ্বান করেন। প্রশান্তচন্দ্র প্রবল উৎসাহের সঙ্গে রাশিবিজ্ঞান সংক্রান্ত তার গবেষণার বিভিন্ন বিষয় ও প্রণালী ব্যবহার করে তাকে সাহায্য করেন। আবার ১৯২৩ খ্রীস্টাব্দে তৎকালীন আবহাওয়া অফিসের ডিরেক্টর স্যার গিলবার্ট ওয়াকারের অনুরােধে তিনি আবহাওয়া সংক্রান্ত কয়েকটি সমস্যা রাশিবিজ্ঞান পদ্ধতি প্রয়ােগ করে সহজেই সমাধান করেন। এ সমস্ত বিষয়ে প্রকাশিত একাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রশান্তচন্দ্রের কৃতিত্বের সূচক।

নৃবিজ্ঞান ও রাশি বিজ্ঞানের সমন্বয়

এতদ্ব্যতীত নৃবিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণায়ও প্রশান্তচন্দ্র বিশেষ পারদর্শিতার পরিচয় দেন। তিনি উপলব্ধি করেন সামাজিক প্রগতি এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সাফল্যের জন্যও পরিসংখ্যান বিজ্ঞানের প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে। এই বিষয়ে তার মৌলিক চিন্তা ও গবেষণা আধুনিক নৃবিজ্ঞানকে উন্নত করেছে। এই বিষয়ে প্রশান্তচন্দ্রের প্রথম উল্লেখযােগ্য গবেষণা- -The Statistical Analysis of Anglo-Indian Stature’. ১৯২২ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। নৃতত্তে তার সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ গবেষণা “Analysis of Race Mixture in Bengal, এই সমস্ত নিবন্ধে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গীর মৌলিকতা এবং বিশ্লেষণ পদ্ধতি লক্ষণীয়। রাশিবিজ্ঞানের সঙ্গে নৃবিজ্ঞানের সমন্বয় প্রশান্তচন্দ্রের জীবনের আর এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। এই সমস্ত গবেষণায় তিনি যে নতুন জটিল পরিসংখ্যানাশ্রয়ী বিশ্লেষণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, তা মহলানবিশ ডি-স্কোয়ার ডিসট্যান্স’ (Mahalanobish D2 -Distance Function ) নামে পরিচিত। রাশিবিজ্ঞানে এ এক নতুন পরিসংখ্যান-শাখা। সংখ্যাতত্ত্ব সংক্রান্ত এই সমস্ত গবেষণার জন্য ১৯৪৪ খ্রীস্টাব্দে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ওয়েল-ডন পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেন। এর পরের বছরই (১৯৪৫ খ্রীস্টাব্দে) প্রশান্তচন্দ্র রয়েল সােসাইটির ফেলাে (F.R.S.) নির্বাচিত হন। ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দে তিনি ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ খ্রীস্টাব্দে প্রশান্তচন্দ্র ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউটেরও সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৬১-তে তিনি পান বিশ্বভারতীর। “দেশিকোত্তম’ আর ১৯৬৮-তে ভারত সরকার তাকে পদ্মবিভূষণ’ দান করে সম্মানিত করেন।

এটিও পড়ুন – র‍্যাগিং ও ছাত্রসমাজ প্রবন্ধ রচনা 600 শব্দের মধ্যে

রাশি বিজ্ঞান প্রসারে ভুমিকা

ভারতবর্ষে রাশিবিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতে এবং সর্বত্র এর প্রভাব বিস্তৃত করতে প্রশান্তচন্দ্র অজস্র পরিশ্রম করেন। তিনিই ১৯৪১ খ্রীস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম রাশিবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং তিনিই এই শাখার বিভাগীয় প্রধান হন। বর্তমান ভারতের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই এই বিষয়ে পড়ানাে হয়ে থাকে। ১৯৪২ খ্রীস্টাব্দে গণিত শাখার সঙ্গে পরিসংখ্যান বিজ্ঞানকে যুক্ত করা হয় এবং ১৯৪৫ খ্রীস্টাব্দে পরিসংখ্যানের একটি পৃথক শাখা প্রবর্তিত হয়। শেষ পর্যন্ত ‘রাশিবিজ্ঞান’, প্রশান্তচন্দ্রের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়, ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দে বিজ্ঞানের একক শাখারূপে মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়। বর্তমানে পরিসংখ্যান বিজ্ঞানে দুটি বিভাগ আছে—তাত্ত্বিক এবং ফলিত। ১৯৫৯ খ্রীস্টাব্দে কেন্দ্রীয় সরকার I.S.I.-কে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংস্থা রূপে স্বীকৃতি দেন এবং সংস্থাটি ডিগ্রী দেওয়ার অধিকার অর্জন করে। প্রশান্তচন্দ্র আমরণ এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ছিলেন। তিনি দেশ-বিদেশের শিক্ষককুল এবং উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে (এখানেই ভারতের প্রথম কম্পিউটার বসানাে হয় মূলত মহলানবিশ এবং হােমি জাহাঙ্গীর ভাবার প্রচেষ্টায়) Indian Statistical Institute-কে আন্তর্জাতিক খ্যাতি দান করেন।

জাতীয়জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের অবস্থা পর্যালােচনা করতে বর্তমানে আমরা সর্বদা যে পরিসংখ্যান পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে থাকি, সেই পদ্ধতিটির নাম ‘ব্যাপক নমুনা সমীক্ষা (Extensive Sample Survey)। বর্তমানে বহুল প্রচারিত Theory and practice of large Scale Sample Survey ‘র জনকরূপেও তিনি পরিচিত। এ ছাড়া তাঁর Group Test, Design of experiments ইত্যাদি গবেষণাধর্মী কাজ উল্লেখযােগ্য। ১৯৩৩ খ্রীস্টাব্দে তিনি রাশিবিজ্ঞানের ওপর ‘সংখ্যা’ নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করেন। এখনো এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি আজও বিশ্ববন্দিত।

অন্যবিধ কৃতিত্ব

এইভাবে প্রশান্তচন্দ্রের নিরস্তর গবেষণায় কৃষিক্ষেত্র থেকে জাতীয় অর্থনীতি পর্যন্ত উন্নত হতে থাকে। এ বিষয়ে তিনি অবশ্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন ১৯২২ খ্রীস্টাব্দেই। সেই বছর বঙ্গীয় সরকারের আমন্ত্রণে উত্তর বাংলা এবং ওড়িশায় ভয়াবহ বন্যার প্রেক্ষিতে এ দেশে বন্যার উৎপত্তি সম্পর্কে গবেষণা করেন। সেই গবেষণা যে ফলপ্রসূ হয় তার প্রমাণ ওড়িশার হীরাকুদ বাধ নির্মাণ। তবে প্রশান্তচন্দ্র ১৯৩৭ খ্রীস্টাব্দ থেকে নিয়মিতভাবে কৃষিসামগ্রীর ওপর তথ্য-সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। তিনি ১৯৩৭ খ্রীস্টাব্দে সমগ্র বাংলা ও বিহারের পাট উৎপাদনের পরিমাণ এবং ১৯৪৩ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে অন্যান্য প্রধান প্রধান কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ নির্ণয় করেন। এইভাবে ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন কৃষিপণ্য-বিষয়ক তথ্যাদি সংগ্রহ করে সর্বত্র প্রশংসাধন্য হন।

দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং প্রশান্তচন্দ্র

পরবর্তীকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর আমন্ত্রণে জাতীয় আয় বৃদ্ধি, বেকার সমস্যার সমাধান ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রশান্তচন্দ্র নিজেকে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনিই চার দশক আগে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক যােজনার তাত্ত্বিক কাঠামাে রচনা করেন। সেই যােজনা ছিল প্রশান্তচন্দ্র ও জওহরলালের যৌথ উদ্যোগ। সেই যােজনার যে মডেল প্রশান্তচন্দ্র তৈরি করেছিলেন—যা “মহলানবিশ মডেল’ নামে পরিচিত, তার একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল জাতীয় সঞ্চয় বিনিয়ে়াগের সময় প্রধান প্রধান (basic) এবং ভারী (heavy) যন্ত্রপাতি নির্মাণের কলকারখানাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ সেক্ষেত্রে স্বদেশী শিল্পই দ্রুত শিল্প নির্মাণের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে পারবে—ফলত দেশ দ্রুত শিল্পে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে। প্রশান্তচন্দ্র যখন মস্কোয় সােভিয়েত যােজনার প্রধান দপ্তর ‘গসপ্ল্যান-এ কাজ করেছিলেন, তখনই তিনি এই স্বনির্ভরতার প্রতি প্রভাবিত হন। পরবর্তীকালে সদ্য স্বাধীন ভারতবর্ষকে স্বনির্ভর করবার জন্য তার এবং জওহরলালের প্রচেষ্টার যুগ্ম মিলনেই গড়ে ওঠে ভারতীয় যােজনা এবং রাষ্ট্রনিয়্ত্রিত অর্থনীতি। দুঃখের কথা, উক্ত যােজনার মডেল এবং আদর্শ অনুসরণ করে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি অর্থনীতি পরিচালনার ফলে কয়েকটি বৃহৎ শিল্প-কারখানা, সেচ প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা আই, এস, আই.-এর মতাে গবেষণা-প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও ঐ মডেল ব্যর্থ হয়। বস্তুতপক্ষে একটি গণতান্ত্রিক দেশের অর্থনীতি নির্মাণ এবং রূপায়ণের সময় অপর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যুক্তি অনুসরণ করার ফলে প্রথম থেকেই বাজার ভেঙে পড়ে এবং ক্রেতাদের স্বাভাবিক চাহিদা বিনষ্ট হয়। ভারতীয় অর্থনীতির এই অবস্থাকে ‘বৃহৎ নাবালক বলা হয়েছিল। অবশ্য বর্তমান ভারতীয় অর্থনীতির মােড় ঘুরলেও, প্রশাস্তচন্দ্রের মর্যাদাহানি ঘটে নি; কারণ যুগে যুগে পরিপ্রেক্ষিতের পরিবর্তন হয়, তাতে পূর্ববর্তী ধ্যান-ধারণা-গবেষণা মূল্যহীন হয়ে পড়ে না।

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের কৃতিত্বের অন্যদিকে এবার চোখ ফেরানাে যাক। প্রধানত বৈজ্ঞানিক হলেও সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তার প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। রবীন্দ্রনাথের ওপর তার গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ ছিল। প্রেসিডেন্সীতে অধ্যাপনার সময়ই তিনি এবং সুকুমার রায় প্রবল প্রতিবাদের মুখেও বারবার ব্রাহ্মসমাজের কার্য নির্বাহক সমিতির সভায় প্রস্তাব আনেন যে, রবীন্দ্রনাথকে সাম্মানিক সদস্য করা হােক। ব্যর্থ হয়ে তিনি কেন রবীন্দ্রনাথকে চাই’ এই শিরােনামে বাহান্ন পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা লিখে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত মূলতঃ তারই প্রচেষ্টায় ১৯২১-এর বার্ষিক অধিবেশনে ব্যালট-ভােটে রবীন্দ্রনাথ উক্ত সংস্থার সদস্য নির্বাচিত হন।

সাহিত্যে অনুরাগ ও রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রশান্তচন্দ্রের গেহের সম্পর্ক ছিল। তিনি শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ছাত্র না হলেও প্রাক্তন ছাত্রদের সংগঠন ‘আশ্রমিক সংঘের সদস্য হয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথেরই কথায়। পরবর্তীকালে তার ওপর নির্ভরতা খুব বেড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের। রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্য সংকলন ‘চয়নিকা’র (অধুনা অপ্রচলিত) কবিতা বাছাই করেছিলেন। মূলত প্রশান্তচন্দ্রই। শেষ পর্যন্ত তিনি রবীন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গ সহচরদের অন্যতম হয়ে ওঠেন, বিশ্বভারতী সােসাইটির সচিবও হন। প্রশান্তচন্দ্রের পত্নী রানীও ছিলেন রবীন্দ্র স্নেহধন্যা। তারা দুজনেই অনেকবার রবীন্দ্রনাথের বিদেশ ভ্রমণের সঙ্গী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় এলে প্রশান্তচন্দ্রের বরানগরের বাড়িতে উঠতেন। পরে রবীন্দ্রনাথই প্রশান্তচন্দ্রের নতুন বাড়ির নাম দেন ‘আম্রপালি।

উপসংহার

স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ বহুধা কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন। রাশি উপসংহার বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে তিনি বিশ্বখ্যাত হলেও, অন্যান্য দিক থেকেও তিনি স্মরণযােগ্য। ১৯৯২-এর ২৮শে জুন, জন্মদিনের মাত্র একদিন আগে এই রাশিবিজ্ঞানী আমাদের ছেড়ে চলে যান। ভারতীয় বিজ্ঞানে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ট্যাগঃ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ রচনা, জেনে নিন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ সম্পর্কে বিস্তারিত, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ প্রবন্ধ রচনা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button