প্রবন্ধ রচনা

একটি নদীর আত্মকাহিনী প্রবন্ধ রচনা। A River Autobiography

A River Autobiography Essay Writing

নদীর আত্মকাহিনী প্রবন্ধ রচনা শেয়ার করা হল। নদীর অনেক নাম রয়েছে যেমন তটিনী, তরঙ্গিনী, সরিৎ ইত্যাদি। নদী সাধারণত মিষ্টি জলের একটি প্রাকৃতিক জলধারা যা ঝরনাধারা, বরফগলিত স্রোত অথবা প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্ট হয়ে প্রবাহ শেষে সাগরমহাসাগরহ্রদ বা অন্য কোন নদী বা জলাশয়ে পতিত হয় ।

একটি নদীর আত্মকাহিনী

দীর্ঘদিন একটানা অবিশ্রান্ত গতিতে ছুটে চলেছি। আপন চলার বেগে পাগল হয়ে শুধু চলাতেই আমার আনন্দ। দিনের পর দিন দুর্দম বেগে ছুটে সীমাহীন সাগরবক্ষে পৌঁছেছি। এতদিন চলমান জীবনের তরঙ্গিত অসংখ্য প্রবাহে নিজের অস্তিত্ব পর্যন্ত ভুলেছিলাম, আজ জীবনের গতিতে বিরতির সময়। পুনরায় নিজের কথা ভাববার অবসর পেয়েছি। বিস্তৃত প্রায় শৈশব থেকে জীবনের এই শেষ পরিণতি পর্যন্ত সমস্ত কথা আজ মানস পটে ভেসে উঠেছে। আমি একটি নদী, নাম আমার মেঘনা।’শরতের একটি রৌদ্রোজ্জ্বল সুন্দর প্রভাত। বৃক্ষ-লতা, পত্র-পুষ্প ও তৃণ-রাজির উপর শুভ্র শিশিরবিন্দু টলমল করে কৌতুক হাসিতে ভেঙ্গে পড়ছে। নিস্তব্ধ বনভূমি বিহঙ্গের কল-কাকলিতে মুখরিত। প্রভাতে সূর্যের নির্মল আলোকে সমস্ত ধরণী ঝলমল করছে। আকাশের সীমাহীন নীলে লঘু-পক্ষ শুভ্র মেঘের দল ভেসে চলছে। দিগন্তের পাহাড় পর্বতে, বনে প্রান্তরে এক অনির্বচনীয় আনন্দের সুর ধ্বনিত হচ্ছে। পাষাণ গিরিগুহার নিভৃত কোণে সেই অজানা আনন্দের সুর শুনে চোখ মেলে। আঁধার গিরিগুহার ফাটলে ফাটলে প্রভাত সূর্যের নিঃশব্দ আগমনে নিজে বিস্মিত হোলাম।

আমি বিস্মিত নয়ন মেলে বিশ্ব-জগতের বিরাট প্রাণ-স্পন্দন অনুভব করতে পারলাম। প্রাণে এক অদ্ভুত অনুভূতির সঞ্চার হল; দেহের সমস্ত স্নায়ুকেন্দ্রে এক অপূর্ব প্রাণচেতনার শিহরণ জেগে উঠল। দেহের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে এক অশান্ত কর্মময় জীবনের সুর ধ্বনিত হয়ে উঠল।

বিশ্ব সংসারে হৃদয়-মনকে প্রসারিত করে দেবার জন্য সমস্ত অন্তরে তীব্র, আবেগ সঞ্চারিত হল। ক্ষুদ্র জীবনের সীমা অতিক্রম করে বৃহৎ জীবনের সাথে মিলিত হবার জন্য ব্যাকুল হলাম। অন্ধকার পার হয়ে আলোকের রাজ্যে পৌঁছাবার জন্য আকুলতার সৃষ্টি হল। এতদিন গিরিগহ্বরে আবদ্ধ ছিলাম। বহির্জগতের সাথে কোন যোগ ছিল না—কোন গতিশক্তি ছিল না। সহসা আজ আমার স্বপ্ন ভঙ্গ হল; তাই বহির্জগতের প্রাণ-আনন্দ, আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সুসম্পন্নভাবে অনুভব করে এদের সাথে মিলিত হবার বাসনা জাগল। এ যেন—

“আজি এ প্রভাতে রবির কর

কেমনে পশিল গুহার পর,

কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখীর গান।

না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।

উপলখণ্ডে নুড়ি বাজিয়ে নৃত্য-চপলা হাস্যময়ী গতি-ভঙ্গিতে স্তব্ধ পাহাড় পর্বত শ্যামল বনভূমি মুখরিত করে চলেছি। আমার চলার প্রচণ্ড বেগে পাষাণ পর্বত পাত্রস্থ কঠিন শিলা স্থানচ্যূত হয়ে পড়ছে। সশব্দে বন্ধুর পর্বতগাত্র থেকে হঠাৎ নিম্নে পতিত হবার দরুন প্রবল জলরাশি ঊর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে। উজ্জ্বল মুক্তাবিন্দুর ন্যায় শুভ্র শিশির কণার উপরে সহস্রধারায় সূর্য কিরণ পতিত হয়ে রঙের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে।

ধীরে ধীরে শৈলমালার বন্ধুরতা শেষ হয়ে আসলো। প্রসারিত মসৃণ সমতল ভূমিতে অবতরণ করলাম- গতিবেগ সহজ ও স্বচ্ছন্দ হল। তৃণগুলাময় সমতল ভূমির স্নেহকোমল স্পর্শে আমার উচ্ছল উদ্দাম গতিভঙ্গি আশ্চর্য রকম স্থির মন্থর হয়ে আসল। চঞ্চলা কলহাস্যময়ী ক্ষীণকায়া নির্ঝরিণী থেকে পরিবর্তিত হয়ে একটি বৃহৎ শান্ত স্রোতস্বিনীর আকার ধারণ করলাম। বহুদূরে এইভাবে আঁকাবাকা গতিতে অগ্রসর হয়ে অবশেষে শস্য-শ্যামল পূর্ব বাংলায় প্রবেশ করলাম। পূর্ব বাংলার অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সম্মোহনী শক্তিতে আমি মুগ্ধ হলাম। আমার দুই তীরে কত নতুন দৃশ্য। পূর্ব বাংলার প্রবল বর্ষার সমারোহ আমার বুকে জোয়ার এসে কালো জলে ভেসে গেল। রাত্রিদিন ছলছল তরঙ্গের কানাকানি চলতে লাগল। গভীর নীল আকাশের স্তূপীকৃত মেঘ দলের ছায়া আমার গভীর অতল বুকের উপর পতিত হয়ে জল আরো কালো করে তুলল। তাই বুঝি আমার নাম হল ‘মেঘনা।’ আমার দুই তীরে দিগন্ত বিস্তৃত ধান আর পাট ক্ষেতের সতেজ শ্যামল রূপের দিকে তাকালে চোখ জুরিয়ে যায়। ধীরে ধীরে আমারই দুই তীরে কত শত গ্রাম, বন্দর, গঞ্জ, হাট, বাজার ইত্যাদি জনপদ গড়ে উঠল। তীরে তীরে মানুষের বহু বিচিত্র জীবনযাত্রা ও তাদের কল-কোলাহলে বিস্মিত হতে লাগলাম। কান পেতে তাদের ভাষা বুঝবার চেষ্টা করি। সকাল-সন্ধ্যায় কত জাহাজ, লঞ্চ, নৌকা, জেলে ডিঙ্গি আমার বক্ষে আলোড়ন তুলে চলে যায়। কখনও গোধূলি রক্তিম আলো রঙের খেলা খেলে, কখনও বা গভীর নিশিতে মাঝিদের কণ্ঠে ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, বাউল গানের করুণ মধুর সুর ধ্বনিত হয়ে উঠে।

আর কত দূর? কতদিন আর এমনি করে চলব? এভাবে ছুটে চলার পর হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম যে, আমার বুকের ওপর—এপার-ওপারে সেতু তৈরি করা হবে। হ্যাঁ, সেতু তৈরির কাজ দ্রুত চলতে লাগল, এবং একদিন সেত তৈরির কাজ সমাপ্তও হল। মহাসমারোহে সরকারী কর্মকর্তারা সেতুর উদ্বোধন করলেন। কত লোক! তারা আনন্দে এখন আমার বুকের ওপর একটি সেতু তৈরি করে জয়ধ্বনি করে উঠল। লোকে এর নাম দিয়েছে-“মেঘনা সেতু” জাপান বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু। দীর্ঘদিন একভাবে ছুটে চলার পর অবশেষে একদিন অলক্ষিতে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যকেন্দ্র ও নদী-বন্দর চাঁদপুরে এসে পৌছালাম। এখানে হঠাৎ স্বজাতীয় পদ্মার সাথে মিলিত হয়ে আনন্দিত হলাম। দুইজনে হেসে খেলে কথার স্রোতে গা ভাসিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই অসীম সমুদ্রের কোলে স্থান লাভ করলাম। অবিরাম দীর্ঘ যাত্রাপথের শেষে পরম ঈন্নিতের দেখা পেয়েছি তার স্নেহশীল বক্ষে নিজেকে নিঃশেষে বিলীন করে জীবনের চরম সার্থকতার সন্ধান পেয়েছি। আমি নদী-সাগরের বুকেই আমার পরিসমাপ্তি।

ট্যাগঃ একটি নদীর আত্মকাহিনী প্রবন্ধ রচনা, নদীর আত্মকাহিনী প্রবন্ধ, একটি নদীর আত্মকাহিনী প্রবন্ধ রচনা PDF, জেনে নিন একটি নদীর আত্মকাহিনী রচনা, একটি নদীর আত্মকাহিনী ৬০০ শব্দের মধ্যে প্রবন্ধ রচনা, নদীর আত্মকাহিনী রচনা।

লেখা পাঠিয়েছে- শিপ্রা রায়, কুশমণ্ডি, দক্ষিন দিনাজপুর।

এগুলিও পড়তে পারেন -

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + sixteen =

Back to top button