প্রবন্ধ রচনা

জনসেবা প্রবন্ধ রচনা 700 শব্দের মধ্যে

জনসেবা রচনা অথবা সমাজ সেবা রচনা

জনসেবা (Public service) হোক মানুষের পরম ধর্ম। আর এই ধরাধামে মানুষের মধ্যে হিংসা নিন্দা ও অহংকার দূর হোক চিরতরে। তাহলে এই পৃথিবী হবে সুন্দর ও আর নির্মল। সমাজে মিলে মিশে বসবাস করতে গেলে জনসেবা করা প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য।

জনসেবা

ভূমিকা:

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। পরস্পরের সাহায্য ব্যতীত তাহারা জীবনধারণ করিতে পারে না। শৈশবে মানব সন্তান মাতাপিতার মুখাপেক্ষী হয়। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাহার প্রয়োজন বৃদ্ধি পায় এবং তাই তাহাকে অপরের সাহায্যের উপর আরও নির্ভরশীল হইতে হয়। কি গ্রাসাচ্ছাদন সংস্থান, কি বাসগৃহ নির্মাণ, কি বিলাসোপকরণ সংগ্রহ, কি বিদ্যার্জন, কি ধর্মশিক্ষা লাভ, কি ব্যাধির প্রতিকার প্রতি কার্যেই মানুষকে পরস্পরের সাহায্য গ্রহণ করিতে হয়। নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে সাহায্য বা সেবা করার নামই জনসেবা।

জনসেবাই মহাপুরুষগণের কর্মাদর্শ:

হযরত মুহম্মদ (দঃ) বলিয়াছেন  “মানুষের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ, যিনি মানুষের উপকার করেন।” মহাপুরুষগণ তাঁহাদের জীবনের কার্য ও উপদেশাবলী দ্বারা শুধু এই শিক্ষাই জগদ্বাসীকে দিয়া গিয়াছেন যে, মানবসেবা বা জনসেবাই স্রষ্টার সেবা। জনসেবাই সমাজসেবা। তাঁহারা জগতের আপামর সাধারণকে আপনার ভাইবোন বলিয়া নানাভাবে তাহাদের মঙ্গল সাধনের চেষ্টা ও সেবা করিয়া গিয়াছেন। মানুষের ভালোবাসায় পাগল হইয়া তাহাকে উদ্বুদ্ধ করিবার চেষ্টাতেই হযরত ঈসা (আঃ) হাসিমুখে ক্রুশযূপকাষ্ঠে প্রাণ দিয়াছেন এবং সেই মৃত্যুর সময়েও কৃতঘ্ন মানবকে ক্ষমা করিবার জন্য আল্লাহর নিকট কাতর প্রার্থনা জানাইয়াছেন। ‘রোগ-শোক, জবা মৃত্যুরিষ্ট মানবের দুঃখের ব্যথা দূর করিবার উপায় অনুসন্ধানের জন্যই মহাপুরুষ বুদ্ধদেব সাম্রাজ্য, সুখ, ঐশ্বর্য এবং মাতাপিতা ও স্ত্রী-পুত্রের বন্ধন ছিন্ন করিয়া পথে বাহির হইয়াছিলেন। মানব প্রেমের জন্যই মানবশ্রেষ্ঠ হযরত মুহম্মদকে (দঃ) পৌত্তলিক দুষ্ক্ৰিয়াসক্ত মানুষকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, তমসাচ্ছন্ন জনগণের নির্যাতন সহ্য করিতে হইয়াছিল। প্রেমধর্ম শিখাইবার জন্য শ্রীগৌরাঙ্গ মানবের দুয়ারে দুয়ারে যাচিয়া প্রেম নাম বিলাইয়াছেন; পাষণ্ড ও দুদ্রিয়াসক্ত মানবের হস্তে আঘাত পাইয়া আপনার দেহ রক্তাক্ত হইয়াছে, তবু প্রেমামৃত দানের জন্য তাহাকে অগ্রসর হইতে হইয়াছে। শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট এই মানবপ্রেম শিক্ষা করিয়াই তাহার দিগ্বিজয়ী শিষ্য বিবেকানন্দ সারাবিশ্বে মানবপ্রেম প্রচার করিয়া গিয়াছেন। মুসলিম দরবেশগণ এভাবেই দুঃখ-পীড়িতদের চিরদিন উপকার সাধন করিয়া গিয়াছেন।

জনসেবাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম:

জনসেবা বা মানব সেবা বলিতে অন্ধ, আতুর, দরিদ্র বা ভিখারীকে এক মুষ্টি অন্ন, দুইটি পয়সা, একখণ্ড বস্ত্ৰ বা কিছু ঔষধ-পত্ৰ দিয়া সাহায্য করা বুঝায় না। নিজের সর্ব স্বার্থ বিসর্জন দিয়া ধনী-দরিদ্র, আতুর-অনাথ, শত্রু মিত্র নির্বিশেষে আপামর সাধারণকে আপন সহোদর ভাবিয়া সর্বতোভাবে তাহার মঙ্গল সাধনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করাই জনসেবা। এইরূপ নিষ্কাম জনসেবাই মহামানব ধর্ম—ইহাই প্রকৃত সমাজসেবার আদর্শ। জগতে আমরা যাহা কিছুই দেখি তৎসমুদয় এক বিরাট শক্তি কর্তৃক সৃষ্ট। সেই বিরাট শক্তিই আল্লাহ। আমরা সকলেই তাঁহার বান্দা। তাই সকলেই ভাই ভাই। কাজেই কাহারও প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করা উচিত নহে। আল্লাহর সৃষ্ট জীবকে ভালবাসিতে পারিলে তবেই আমরা তাঁহাকে ভালবাসিতে সমর্থ হইব।

এই সংসারে কোন লোক ধনাঢ্য, কেহ নির্ধন, কেহ উচ্চকুলজাত, কেই হীন-বংশসদ্ভূত, কিন্তু সকলেই এক বিশ্ব স্রষ্টার সন্তান, সুখ-দুঃখ বোধশক্তি সকলেরই সমান। সুতরাং এক বিধাতার রাজ্যে বাস করিয়া পরস্পর ভেদবুদ্ধি পরিহার করাই একান্ত বাঞ্ছনীয়। বস্তুত, মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বভাব স্থাপনই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক। এই ভ্রাতৃত্বভাব বা সাম্যভাবের মধ্যে জনসেবার বীজ গুপ্তভাবে লুক্কায়িত আছে।

শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যাহারা দীন-দুঃখীর ব্যথা মোচনে অগ্রসর না হয় তাহাদের মতো নরাধম আর জগতে নাই। বলাবাহুল্য, স্বার্থবুদ্ধি বা বৃথা মর্যাদাবোধ অনেক সময় তাহাদিগকে সেবাকার্য হইতে বিরত রাখে। ইতর প্রাণীর ন্যায় আত্ম সুখই ইহাদের প্রধান লক্ষ্য। পরোপকারই জীবন; পরহিত চেষ্টার অভাবই মৃত্যু। যাহার প্রেম নাই, সেই মৃত অথবা প্রেত বৈ অন্য কিছু নয়।

এটিও পড়ুন –সাম্প্রদায়িকতা অভিশাপ ও তার প্রতিরোধে ছাত্রসমাজের ভূমিকা

অতিথি সেবা :

প্রাচীনকাল হইতে অতিথি সেবা আমাদের দেশে শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলিয়া গণ্য। তৎকালে জাতিধর্ম নির্বিশেষে অতিথি সৎকার করিয়া গৃহস্থগণ নিজদিগকে ধন্য মনে করিত। স্বহস্তে অতিথি সেবায় মান-সম্ভ্ৰম ক্ষুণ্ণ হয় না। অতিথি তুল্য ধর্ম আর নাই।

কৈশোরে সেবাকার্য শিক্ষা :

বিদ্যালয়ে তরুণদিগকে অন্তরে সেবা ধর্মের বীজ বপনস্বরূপ সেবাব্রতীদল (Boy Scouts) গঠন করা হয়। যদি তাহারা সুষ্ঠুভাবে স্বীয় কর্তব্য পালন শিক্ষা করে তবে আশা করা যায়, তদ্বারা দেশের মহাকল্যাণ সাধিত হইবে। কোন কোন বিদ্যালয়ে প্রাথমিক সাহায্য (First Aid) শিক্ষাদানের ব্যবস্থা আছে। উহা যে মানুষের কত দরকারী তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। এই সেবাধর্মের বীজ কৈশোরেই বালক-বালিকদিগের অন্তরে বপন করিতে হইবে। এই সময়ে তাহারা মাতাপিতার সেবা, পরিবারস্থ আত্মীয়-স্বজনের সেবা, দাস-দাসী, প্রতিবেশী প্রভৃতির সেবা করিয়া সেবাধর্ম পালন শিক্ষা করিতে পারে। সেবার আনন্দে তাহাদের মনের আনন্দ বাড়িবে, মনুষ্যত্বের গৌরব বৃদ্ধি পাইবে। সুতরাং, সেবাকার্য-শিক্ষা কৈশোরে যত সত্বর আরম্ভ করা যায়, ততই সমাজের জন্য মঙ্গলকর।

পল্লীতে সেবাসংঘের প্রয়োজনীয়তা :

পল্লীগ্রামে রোগের প্রাবল্য অত্যধিক উপযুক্ত শুশ্রুষাকারী ও চিকিৎসকের নিতান্ত অভাব। তাই গ্রামে গ্রামে সেবাসংঘ স্থাপন করিয়া যুবকগণ জনসেবা কার্যে নিযুক্ত থাকিলে পল্লীর বহু অসহায় লোককে অকালে মৃত্যুর কবল হইতে রক্ষা করা যাইতে পারে।

উপসংহার :

আর্তজনের সেবা করিলে তাহাদের বদনমণ্ডল কৃতজ্ঞতায় সুন্দর ও সমুজ্জ্বল হইয়া উঠে। সৌন্দর্য অবলোকন করিয়া সেবাপরায়ণ ব্যক্তির অন্তরে যে আনন্দ রসের সঞ্চার হয় তাহা তাহার সেবা কার্যের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। আর্তের ও ব্যথিতের সেবা করিয়া তাহাদিগকে ধন্য করা হয় না, বরং দাতা দান করিয়া, সেবক সেবা করিয়া নিজে ধন্য হয়। জনসেবা সেবকের, এ মনোবৃত্তি লইয়া আমাদের অগ্রসর হইতে হইবে। তবেই সেবা সার্থক হইবে।

(ঈষৎ পরিবর্তিত)    -অক্ষয় কুমার রায়

source: একের ভিতর পাঁচ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button