প্রবন্ধ রচনাপড়াশোনা

কাজী নজরুল ইসলাম প্রবন্ধ রচনা

কাজী নজরুল ইসলাম প্রবন্ধ রচনা, বিদ্রোহী কবি নজরুল প্রবন্ধ রচনা, কাজী নজরুল ইসলাম রচনা, বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি, ইসলামিক বিদ্রোহী কবিতা, বিদ্রোহী কবিতার ইতিহাস, বিদ্রোহী কবিতা ব্যাখ্যা, কাজী নজরুল ইসলাম রচনা, কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ, বিদ্রোহী কবিতা

কাজী নজরুল ইসলাম

প্রবন্ধ রচনা বিদ্রোহী কবি নজরুল / আমার প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম

ভূমিকাঃ
“ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে
ভাগ হয়নি কো নজরুল।”
—অন্নদাশঙ্কর রায়
বড়ো আক্ষেপ করে কবি অন্নদাশঙ্কর পঙক্তি কয়টি লিখেছেন। দেশভাগের বেদনা আর পাঁচজন বাঙালির মতো কবিকেও বিচলিত করেছিল। কিন্তু সব ভাগাভাগির উর্ধ্বে নজরুলকে স্থাপন করে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন নজরুল বাঙালী কবি। সকল সাম্প্রদায়িক গন্ডির বাইরে তার স্থান। সত্যিই নজরুল আমাদের জাতিসত্তার প্রতীক। তাঁর কবিতা আর গান আজও কোটি কোটি বাঙালীর জীবনের মহামন্ত্র ধ্বনিরূপে অনুরণিত। এককথায়—“সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল।”

দারিদ্র্য নিপীড়িত শৈশবঃ

জন্মলগ্নেই নজরুলের ভাগ্যভূমিতে রোপিত হয়েছিল দুর্বিষহ দারিদ্র্যের বীজ। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে মে দীনদরিদ্র কাজি ফকির আহমেদের ঘরে বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের পর্ণকুটিরে অগ্নিশিশু নজরুলের জন্ম হয়। নজরুলের মায়ের নাম জাবেদা খাতুন। শৈশবে তাঁর নাম ছিল দুখু মিঞা। পিতা ছিলেন পরধর্ম সহিষ্ণু অথচ নিষ্ঠাবান মুসলমান।
মাত্র নয় বছর বয়সে নজরুলের পিতৃবিয়োগ হয়। ফলে শৈশবের শিক্ষার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। গাঁয়ের মক্তবের লেখাপড়া বাদ দিয়ে চুরুলিয়ার লেটো গানের দলে যোগ দেন এই সুকন্ঠী শিশু নজরুল। সমকালীন পরিবেশই তাঁকে দিয়েছিল দুঃখ জয়ের মহৎ উত্তরাধিকার। মেধা ছিল প্রখর কিন্তু সীমাহীন আর্থিক সংকটের পাহাড় তাঁর গতিপথে সৃষ্টি করেছিল দুস্থর বাঁধা। এই বাঁধাই সরস্বতীর সূচিসুভ্র অঙ্গন থেকে কঠিন সংগ্রামের রণভূমিতে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
জীবনের আর এক গতিপথঃ
১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশে, গঠিত হয়েছে সাত হাজার সৈনিক নিয়ে বাঙালি রেজিমেন্ট। নজরুলের চেতনায় তখন যৌবনের উন্মাদনা। তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ নামক একটি গল্প ১৯১৯ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ ১৯১৯ সালেই বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হয়। এই কবিতায় তিনি আত্মস্বরূপ উন্মাচন করে বলেছিলেন—
“বল বীর বল উন্নত মম শির
শির নেহারি আমারই নতশির ঐ শিখর হিমাদ্রির।”
কবি জীবনের সূত্রপাতঃ
নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। তারপরে একে একে প্রাকাশিত হয় ‘দোলনচাঁপা’ (১৯২৩), ‘বিষের বাঁশি’ (১৯২৪), ‘ছায়ানট’ (১৯২৪) প্রভৃতি। শুধু কাব্যই নয় অসাধারণ সঙ্গীত রচনাতেও নজরুল আজও কিংবদন্তীর মতো বেঁচে রয়েছে। তাঁর গানে একদিকে যেমন স্বদেশ চেতনা আর মানবপ্রেম প্রচারিত হয়েছে, অন্যদিকে মানব জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষার দ্যোতক প্রেমের অমীয় ধারা প্রাণ প্লাবিত জোয়ারে বাঙালীর মর্মে সৃষ্টি করে অপূর্ব গীতিঝংকার।
সাহিত্যসম্ভারঃ
নজরুলের আবির্ভাব পরাধীন ভারতে। আজীবন দরিদ্র নিপীড়িত কবির মধ্যে ছিল এক কঠিন সংগ্রামের স্পৃহা। তাঁর ওপর সাম্রাজ্যবাদী অপশাসন তাঁর চেতনায় বিপ্লবের অগ্নিসংযোগ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমসাময়িক কালে এবং তার পরবর্তী ব্রিটিশ ভারতে তাঁর কবিতার উজ্জীবনী শক্তি সংগ্রামের বীজ বপন করে। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সর্বহারা’, ‘ভাঙার গান’, ‘কামাল পাশা’, ‘সিন্ধুহিল্লোল’ প্রভৃতিতে তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও সাম্যবাদী চেতনার আপসহীন সংগ্রামের ভাব প্রাকাশিত হয়েছে। ‘সাম্যবাদী’, ‘ফণীমনসা’ নজরুলের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও তাঁর সাহিত্য রচনার সংক্ষিপ্ত তালিকা এইরূপ— ছোটোগল্পঃ ‘ব্যাথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’; উপন্যাসঃ ‘বাঁধনহারা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, নাটকঃ ‘আলেয়া’, ‘ঝিলিমিলি’; কবিতাঃ ‘দোলন-চাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘বুলবুল’—গীতগ্রন্থ ইত্যাদি।

বিদ্রোহী নজরুল:

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব বিশেষত ঔপনিবেশিক শোষণ, অন্যায়, অত্যাচার ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে প্রবল ঝড়ের মতো। তাঁর রচিত কবিতা, গান, প্রবন্ধ, পত্রিকার নিবন্ধ প্রভৃতিতে কবির বিদ্রোহী সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন তিনি ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বলেছেন-
‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
সাম্য ও মানবতাবাদী নজরুল:
নজরুল ইসলাম ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির উর্ধ্বে তিনি শক্ত হাতে কলম ধরেছিলেন। ১৯২৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন- কান্ডারী হুশিয়ার, পথের দিশা, হিন্দু-মুসলমান যুদ্ধ প্রভৃতি কবিতা। কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতায় বলেছেন-
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোনো জন?
কান্ডারী, বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!’
অন্যদিকে নজরুল ইসলামকে বলা হয় সাম্যের কবি, মানবতার কবি। তিনি হিন্দু-মুসলিম, ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষকে সমান চোখে দেখেছেন। ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি বলেছেন
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!

উপাধি ও সম্মানঃ

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টির জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক পান। স্বাধীনোত্তর কালে ১৯৬০ সালে ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হন।
উপসংহারঃ
ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের মতে— “কবি নজরুল ইসলাম বাংলার তথা সমগ্র ভারতের আশা প্রদানকারী কবি। তিনি অনাগত কালের কবি।” নজরুলের সমগ্র সাহিত্যে বাংলাদেশের লোকজীবন তাঁর যথার্থ স্বরূপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তিনি চির বিদ্রোহী তরুণ প্রাণের বার্তাবাহক। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, থাকবে বাঙালি, ততদিন তিনি বাংলার ঘরে ঘরে চিরজাগরুক থাকবেন তাঁর কবিতায়, গানে।
১৯৭৬ সালের ২৯শে মে, আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে রোগ জর্জর কবি গভীর আক্ষেপ বুকে নিয়ে চির বিদায় গ্রহণ করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button